বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১২২ দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০০, বাংলাদেশ এগিয়ে ১৬ ধাপ! শিশু অপুষ্টি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

বিশ্ব ক্ষুধা সূচক ২০২৬-এ ভারতের স্কোর ২৪.১, ক্ষুধা পরিস্থিতি ‘গুরুতর’ শ্রেণিতে। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ১৯ শতাংশের ওজন উচ্চতার তুলনায় কম, যা পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ক্ষুধা ও অপুষ্টি মোকাবিলায় ভারতের অগ্রগতি নিয়ে ফের প্রশ্ন তুলে দিল বিশ্ব ক্ষুধা সূচক ২০২৬ (Global Hunger Index 2026)। ১২২টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০০তম। ভারতের স্কোর ২৪.১, যা ‘গুরুতর’ ক্ষুধা পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। তুলনায় বাংলাদেশ রয়েছে ৮৪তম স্থানে, পাকিস্তান ১০৬তম। তবে ভারতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের অপুষ্টি। বিশেষ করে বয়সের তুলনায় কম ওজনের শিশুদের হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

বিশ্ব ক্ষুধা সূচক প্রকাশ করে ওয়েল্টহাঙ্গারহিলফে (Welthungerhilfe), কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড (Concern Worldwide) এবং ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ল অব পিস অ্যান্ড আর্মড কনফ্লিক্ট (IFHV)। খাদ্যাভাবের পাশাপাশি অপুষ্টি ও শিশুমৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিবেচনা করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ২০২৬ সালের সূচকে ভারতের অবস্থান গত বছরের ১২৩টি দেশের মধ্যে ১০২তম স্থান থেকে দু’ধাপ এগিয়েছে। কিন্তু র‌্যাঙ্কিংয়ে সামান্য উন্নতি হলেও অপুষ্টির একাধিক সূচক এখনও গভীর উদ্বেগের কারণ।

ভারতের মোট ক্ষুধা সূচক স্কোর ২৪.১। এই স্কোর ২০ থেকে ৩৪.৯-এর মধ্যে থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের ক্ষুধা পরিস্থিতিকে ‘গুরুতর’ বা Serious শ্রেণিতে রাখা হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের স্কোর ১৯.২, যা ‘মাঝারি’ বা Moderate শ্রেণির মধ্যে পড়ে। পাকিস্তানের স্কোর ২৫.৫, ফলে সেই দেশও গুরুতর ক্ষুধা পরিস্থিতির শ্রেণিতে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে নেপাল ৭২তম এবং শ্রীলঙ্কা ৫৩তম স্থানে রয়েছে। অর্থাৎ, আঞ্চলিক তুলনায় ভারতের সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

শিশু অপুষ্টির পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক। সূচকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে ১৯ শতাংশের ওজন তাদের উচ্চতার তুলনায় কম। এই অবস্থাকে ‘চাইল্ড ওয়েস্টিং’ (Child Wasting) বলা হয়। সাধারণত তীব্র অপুষ্টি বা অসুস্থতার সঙ্গে এই সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার ভারতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ২৯.৩ শতাংশের উচ্চতা তাদের বয়সের তুলনায় কম, যা দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির ইঙ্গিত দেয়। এই সমস্যাকে বলা হয় ‘চাইল্ড স্টান্টিং’ (Child Stunting)।

তবে ছবির অন্য দিকও রয়েছে। ভারতে অপুষ্টিতে থাকা জনসংখ্যার হার ৯.৮ শতাংশে নেমেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের খর্বাকৃতির হারও ২০০০ সালের ৫০ শতাংশ থেকে কমে ২৯.৩ শতাংশ হয়েছে। পাঁচ বছরের আগে শিশুমৃত্যুর হার বর্তমানে ২.৭ শতাংশ। অর্থাৎ, কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও শিশুদের পুষ্টির পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি এখনও হয়নি। বিশেষ করে চাইল্ড ওয়েস্টিংয়ের হার বেড়ে ১৯ শতাংশ হওয়া নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্ব ক্ষুধা সূচক তৈরির ক্ষেত্রে মোট চারটি বিষয় বিবেচনা করা হয়—জনসংখ্যার কত অংশ পর্যাপ্ত ক্যালোরি পাচ্ছে না, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের হার, বয়সের তুলনায় কম উচ্চতার হার এবং পাঁচ বছরের আগে শিশুমৃত্যুর হার। ফলে এই সূচক শুধুমাত্র খাদ্য উৎপাদন বা খাদ্যের প্রাপ্যতা মাপে না; মানুষের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতিরও ইঙ্গিত দেয়।

শিশু অপুষ্টির পিছনে শুধু খাবারের অভাবই দায়ী নয়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা, মায়েদের পুষ্টি, নিরাপদ পানীয় জল, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং শিশুদের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবারের বৈচিত্র—সবকিছুরই প্রভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া গেলেও সেই খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি না থাকলে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি শিশুর শেখার ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বের সামগ্রিক ছবিও স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৬ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে বিশ্বের গড় স্কোর ১৮.১, যা ২০১৮ সালের তুলনামূলক স্কোর ১৭.৬-এর চেয়ে খারাপ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত, জলবায়ুজনিত বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক সঙ্কট খাদ্য নিরাপত্তার উপর চাপ বাড়াচ্ছে। ৩২টি দেশে ২০১৮ সালের পর ক্ষুধা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অর্থাৎ, বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতিও বাধার মুখে পড়েছে।

ভারতের ক্ষেত্রে তাই শুধু র‌্যাঙ্কিংয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়াকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখলে চলবে না। শিশুদের অপুষ্টি, পুষ্টিকর খাবারের নাগাল এবং দরিদ্র পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তার মতো সমস্যাগুলির স্থায়ী সমাধান জরুরি। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টির পরিস্থিতিতে কতটা প্রভাব ফেলছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে—ভারতে ক্ষুধা ও অপুষ্টি মোকাবিলায় এখনও অনেকটা পথ চলা বাকি।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর