হাসিনা জমানার প্রাক্তন বায়ুসেনা প্রধান কাতারে গ্রেপ্তার, দেশে ফেরানোর উদ্যোগ বাংলাদেশের

২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বায়ুসেনা প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন শেখ আবদুল হান্নান। তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

বাংলাদেশের প্রাক্তন বায়ুসেনা প্রধান শেখ আবদুল হান্নানকে দুর্নীতির মামলায় কাতারে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ১৫ অক্টোবর তাঁকে আটক করে কাতার পুলিশ। ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানায়, ইন্টারপোলের ই-মেলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারের খবর নিশ্চিত হয়েছে। এবার তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার উদ্যোগ শুরু করেছে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ।

আবদুল হান্নানের বিরুদ্ধে আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা করেছে দুদক। তবে এই অভিযোগগুলির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে অভিযোগ ও আদালতে প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।

ঠিক কী অভিযোগ রয়েছে প্রাক্তন বায়ুসেনা প্রধানের বিরুদ্ধে?

বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে দাবি করা হয়েছে, শেখ আবদুল হান্নান তাঁর জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ প্রায় ৩ কোটি ২৮ লক্ষ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। তাঁর বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যও পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

দুদকের ২০২৫ সালের মামলার বিবরণে তাঁর ছয়টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় ২৭ কোটি ৬৩ লক্ষ টাকার লেনদেনের অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, ১৮ অক্টোবরের সরকারি ব্রিফিং নিয়ে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে সন্দেহজনক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি ৮ লক্ষ টাকা বলা হয়েছে। এই দুই পরিসংখ্যানের পার্থক্য রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট মামলার নথি যাচাই না করে কোনও একটি অঙ্ককে চূড়ান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

তদন্তকারীদের অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম এবং অর্থ পাচারের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করা হয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই এই অভিযোগে মামলা দায়ের করে। মামলাগুলির তদন্ত এখনও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।

স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধেও মামলা

শুধু প্রাক্তন বায়ুসেনা প্রধান নন, তাঁর স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধেও আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন এবং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছে দুদক।

কমিশনের অভিযোগ অনুযায়ী, তাহমিদার নামে প্রায় ১ কোটি ৯১ লক্ষ টাকার অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। পাশাপাশি তাঁর নামে থাকা ৩২টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১ কোটি ১৮ লক্ষ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য সামনে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই অভিযোগগুলির ভিত্তিতে আবদুল হান্নান ও তাঁর পরিবারের সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তবে আর্থিক লেনদেন সন্দেহজনক বলে চিহ্নিত হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, এমন নয়।

সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের নির্দেশ

দুর্নীতির তদন্ত চলাকালীন আবদুল হান্নান ও তাঁর পরিবারের সম্পত্তির উপরেও আইনি পদক্ষেপ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে আদালতের নির্দেশে তাঁর নামে থাকা জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একই সঙ্গে তাঁর এবং পরিবারের সদস্যদের একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের লেনদেন বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ মে তাঁর স্ত্রী ও ছেলের নামেও থাকা অ্যাকাউন্ট-সহ মোট ৩৮টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়েও সম্পত্তি সংক্রান্ত বিষয়ে আদালতের নির্দেশ চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

তদন্তকারীরা বাংলাদেশে থাকা সম্পত্তির পাশাপাশি বিদেশে তাঁর সম্পদ সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করেছেন। কাতার, কানাডা ও দুবাইয়ে সম্পত্তির সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে কাতারে?

এই মামলার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও আবদুল হান্নান কীভাবে বাংলাদেশ থেকে কাতারে পৌঁছলেন। ২০২৫ সালের ৫ মে আদালত তাঁর, তাঁর স্ত্রী এবং ছেলের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

তবে নিষেধাজ্ঞা জারির পর তিনি কীভাবে দেশ ছেড়েছিলেন, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনও স্পষ্ট নয়। এই প্রশ্নের উত্তর পেতে ভ্রমণসংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন বায়ুসেনা প্রধান

শেখ আবদুল হান্নান ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। ২০২১ সালের ১২ জুন তিনি বাংলাদেশের বায়ুসেনা প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের ১১ জুন পর্যন্ত ওই পদে ছিলেন তিনি। তাঁর নিয়োগ হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকারের আমলে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। তার পর বাংলাদেশের একাধিক প্রাক্তন সরকারি আধিকারিকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়। সেই প্রেক্ষাপটেই আবদুল হান্নানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের মামলাগুলি সামনে আসে।

তবে কোনও সরকারের আমলে দায়িত্বে থাকা এবং পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া—এই দুই তথ্যের মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর ভিত্তি নেই। আবদুল হান্নানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া।

১৮ অক্টোবর বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব সাইদুর রহমান খান জানান, আবদুল হান্নানকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য আদানপ্রদানের প্রক্রিয়াও চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

কাতারে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে বাংলাদেশে ফেরানো এবং সেখানে মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি করাই এখন কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য। তবে প্রত্যর্পণ বা দেশে ফেরানোর নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনও নিশ্চিত নয়।

শেখ আবদুল হান্নানের গ্রেপ্তার বাংলাদেশের দুর্নীতির তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়ার ফলের অপেক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

Advertisementspot_img

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর