পুজোয় পদ্মার ইলিশ কি এবার আসবে? এখনও মেলেনি রপ্তানির অনুমতি

দুর্গাপুজোর আগে বাংলাদেশ থেকে পদ্মার ইলিশ আমদানির জন্য আবেদন করেছেন এপার বাংলার ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এখনও ছাড়পত্র মেলেনি, উলটে ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ রপ্তানিও বন্ধ করেছে ঢাকা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

মাছে-ভাতে বাঙালির দুর্গাপুজোর ভোজে ইলিশের আলাদা জায়গা রয়েছে। তার উপর যদি হয় পদ্মার ইলিশ, তাহলে উৎসবের পাতে সেই মাছের চাহিদা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর আগে সেই পদ্মার ইলিশ নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতির জন্য আবেদন করা হলেও ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চূড়ান্ত ছাড়পত্র মেলেনি। ফলে পুজোর বাজারে এবার পদ্মার ইলিশ আদৌ কতটা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, দুর্গাপুজোর আগে ভারতে ইলিশ পাঠানোর জন্য সে দেশের ১৮টি সংস্থা আবেদন করেছিল। ভারতীয় মাছ ব্যবসায়ীরাও বাংলাদেশ সরকারের কাছে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বাণিজ্য মন্ত্রক আবেদনগুলি পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে এবং দেশের অভ্যন্তরে ইলিশের প্রাপ্যতা ও চাহিদা যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।

কিন্তু পরিস্থিতি বদলেছে গত কয়েক দিনে। ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ভারত থেকে ইলিশ আমদানির অনুমতিগুলি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয় বলে একাধিক রিপোর্টে উঠে এসেছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে ইলিশের বাণিজ্য নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে কলকাতার মাছ ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বাংলাদেশ যদি এবারও দুর্গাপুজোর আগে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি না দেয়, তাহলে পদ্মার ইলিশের সরবরাহ স্বাভাবিক বছরের তুলনায় অনেকটাই কম থাকতে পারে।

এবারের পরিস্থিতির আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক রয়েছে। সাধারণত দুর্গাপুজোর মরশুমে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ আসে। কিন্তু ২০২৬ সালে ছবিটা উলটে গিয়েছে। গত দু’মাসে ভারত থেকেই বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ গিয়েছে বলে ভারতের মৎস্য মন্ত্রকের তথ্য জানিয়েছে। মূলত গুজরাতের ইলিশই এই রপ্তানির অংশ ছিল। আগামী সপ্তাহগুলিতে আরও ১৫০-২০০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও তখন জানানো হয়েছিল।

অর্থাৎ, যে বাংলাদেশকে এতদিন পদ্মার ইলিশের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে দেখা হত, সেই দেশই এ বছর ভারত থেকে ইলিশ কিনেছে। বাংলাদেশে ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার পরিস্থিতির মধ্যে দেশের বাজারের চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে মাছ আমদানির প্রয়োজন তৈরি হয়েছিল বলে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে ২২ দিনের জন্য ইলিশ ধরা বন্ধ থাকবে। শুধু মাছ ধরা নয়, ওই সময় ইলিশ পরিবহণ, মজুত, কেনাবেচা ও বাজারজাতকরণের উপরও নিষেধাজ্ঞা থাকবে। ইলিশের প্রজনন মরশুমে মা ইলিশ সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ সরকারের তরফে জানানো হয়েছে।

এই নিষেধাজ্ঞার সময়সূচিও এপার বাংলার ব্যবসায়ীদের চিন্তা বাড়াচ্ছে। দুর্গাপুজোর মূল পর্ব অক্টোবরের মাঝামাঝি হওয়ায় নিষেধাজ্ঞার সময়ের সঙ্গে উৎসবের সময় প্রায় মিলে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি এলেও সরবরাহের সময়সীমা এবং মাছের প্রাপ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

তবে বাংলাদেশ সরকার কেন এখনও ভারতে ইলিশ পাঠানোর অনুমতি দেয়নি, তার কোনও নির্দিষ্ট সরকারি কারণ এখনও প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। মাছ ব্যবসায়ী মহলের একাংশ এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাম্প্রতিক ভারত-বাংলাদেশ ইলিশ বাণিজ্যের উল্টো স্রোতের যোগ থাকতে পারে বলে মনে করছেন। তবে এটি ব্যবসায়ী মহলের বক্তব্য, সরকারি ভাবে এমন কোনও কারণ নিশ্চিত করা হয়নি।

ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি সৈয়দ আনোয়ার মকসুদের বক্তব্য অনুযায়ী, এপার বাংলার ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে ইলিশ আমদানির জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু এখনও অনুমতি মেলেনি। একই সময়ে গুজরাত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ যাওয়ার বাণিজ্যও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক রিপোর্টেও বাংলাদেশে ভারতীয় ইলিশ আমদানি বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।

এর আগে দুর্গাপুজোর মরশুমে বাংলাদেশ বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে ভারতে ইলিশ রপ্তানির সুযোগ দিয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে এই বিশেষ রপ্তানি ব্যবস্থা আবার চালু হয়েছিল বলে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে অনুমোদিত পরিমাণ এবং বাস্তবে রপ্তানি হওয়া ইলিশের পরিমাণের মধ্যে বিভিন্ন বছরে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থেকেছে।

ফলে এবার পুজোর বাজারে পদ্মার ইলিশের ভবিষ্যৎ এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। একদিকে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমার খবর, অন্যদিকে ভারত থেকে সেখানে ইলিশ আমদানি, তার সঙ্গে অক্টোবরের দীর্ঘ মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আগের বছরের তুলনায় আলাদা।

এখন নজর বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রক এবং মৎস্য মন্ত্রকের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। শেষ পর্যন্ত দুর্গাপুজোর আগে বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয় কি না, তার উপরই নির্ভর করছে কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের বাজারে পদ্মার ইলিশ কতটা পৌঁছবে। আপাতত তাই পুজোর পাতে পদ্মার ইলিশ নিয়ে বাঙালির অপেক্ষা থাকছেই।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন