কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপুজোয় পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর প্রতিমার মুখ ঘোরানো নিয়ে নিজের বক্তব্য জানালেন পুজো কমিটির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, পুজোর আগে প্রতিমা অন্য দিকে সরানো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন তিনি। তবে প্রতিমার মুখ ঘোরানোর কারণেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে, এমন কোনও দাবি করেননি জয়ন্ত। তাঁর বক্তব্য, ঘটনাটি কাকতালীয়ও হতে পারে।
গত ১৫ বছর চোরবাগান সর্বজনীনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন জয়ন্ত। এ বছর পুজোর আগেই সেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। দুর্ঘটনার পর পুরী থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করে পুজোর পুরনো কিছু নিয়ম এবং অতীতের কয়েকটি ঘটনার কথা তুলে ধরেছেন প্রাক্তন এই পুজো কর্তা।
প্রতিমার মুখ ঘোরানো নিয়ে কী বললেন জয়ন্ত?
জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, চোরবাগানের পুজোয় প্রতিমার মুখ কোন দিকে থাকবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি রীতি রয়েছে। তাঁর দাবি, প্রতিমা যত বড় শিল্পীই তৈরি করুন না কেন, মায়ের মুখ অন্য দিকে ঘোরানো উচিত নয়।
তিনি জানান, অতীতে কয়েক বছর প্রতিমার মুখ অন্য দিকে ঘোরানো হয়েছিল। সেই সময় বিভিন্ন অঘটন ঘটেছিল বলেও দাবি করেছেন জয়ন্ত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পুজোর খুঁটি অন্য দিকে সরানোর পর তাঁর বাবা মারা যান। ২০২৪ সালে মলমাসে খুঁটিপুজোর পর তাঁর একটি প্রিয় কুকুরের মৃত্যু হয় এবং তার পরে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয় বলেও জানিয়েছেন তিনি।
২০২০ সালে করোনা অতিমারির সময় প্রতিমা সরানোর সঙ্গে বিপর্যয়ের যোগ রয়েছে বলেও নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন জয়ন্ত। তবে এগুলি তাঁর ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্বাস। এই ঘটনাগুলির সঙ্গে প্রতিমার অবস্থান পরিবর্তনের কোনও প্রমাণিত কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
দুর্ঘটনার আগে সতর্ক করার দাবি
জয়ন্তর দাবি, এ বছর পুজোর প্রস্তুতি চলাকালীন বন্ধুদের প্রতিমা না সরানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর কথা শোনা হয়নি বলে আক্ষেপ করেছেন প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি চোরবাগানের প্রতিমাকে ‘জাগ্রত’ বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে প্রতিমার মুখ ঘোরানোর সঙ্গে পদপিষ্টের ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছননি তিনি। তাঁর বক্তব্যে কাকতালীয় হওয়ার সম্ভাবনাও স্বীকার করা হয়েছে।
কীভাবে ঘটল চোরবাগানের বিপর্যয়?
পুলিশ ও চোরবাগান সর্বজনীনের সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যায় প্রবল বৃষ্টি এবং রাস্তায় যানজটের মধ্যে বিপর্যয় ঘটে। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বহু মানুষ মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। সেই সময় হুড়োহুড়ির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
তবে ঠিক কী কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, তা নির্ধারণের জন্য ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিমার অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত বক্তব্যকে দুর্ঘটনার প্রমাণিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
মৃতদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চোরবাগানের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন। মৃতদের পরিবারপিছু একজনকে সরকারি চাকরি দেওয়ার পাশাপাশি ২৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করা হয়েছে। আহতদের প্রত্যেককে ৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
এই ঘটনায় পুজোর উদ্যোক্তা ও স্বেচ্ছাসেবক-সহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে তদন্তের ফলই গুরুত্বপূর্ণ হবে।
চোরবাগানের বিপর্যয়ের পর প্রতিমার মুখ ঘোরানো নিয়ে জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস, অতীতের ঘটনার সঙ্গে করা তুলনা এবং দুর্ঘটনার তদন্তে উঠে আসা তথ্য—এই তিনটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।




