১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেলেন ট্রাম্প, ভারতের উপর ১০০% শুল্কের হুমকি স্থগিত

রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা তৈরি করেছিল নতুন মার্কিন আইন। কার্যকরের আগেই সেই আইনের একাধিক বিধান স্থগিত করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের বিধান আপাতত স্থগিত করল আমেরিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ১৬ অক্টোবর ২০২৬ একটি নির্বাহী নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত জানান। এতে ভারতের মতো রুশ জ্বালানির বড় ক্রেতা দেশগুলির উপর প্রস্তাবিত নতুন শুল্কের তাৎক্ষণিক আশঙ্কা কমল। হোয়াইট হাউসের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে।

রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলিকে চাপে রাখতে নতুন আইন তৈরি হয়েছিল আমেরিকায়। সেই আইনের আওতায় রুশ তেল ও গ্যাসের বৃহত্তম পাঁচ আমদানিকারক দেশের পণ্যের উপর অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ১৮ অক্টোবর থেকে নতুন বিধান কার্যকর হওয়ার কথা থাকায় ভারত-সহ একাধিক দেশের বাণিজ্যিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ সিদ্ধান্তকে ভারতের উপর আরোপিত সমস্ত মার্কিন শুল্ক প্রত্যাহার হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। নির্বাহী নির্দেশে মূলত নতুন আইনের নির্দিষ্ট শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার বিধান প্রয়োগে ছাড় দেওয়া হয়েছে। ফলে এই সিদ্ধান্তে প্রস্তাবিত অতিরিক্ত শুল্কের ঝুঁকি কমলেও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের অন্য বিষয়গুলি আলাদা করে বিবেচনা করতে হবে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ট্রাম্প স্বাক্ষর করেছিলেন ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬’ (Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026) নামের আইনে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জোরদার করা এবং মস্কোর সঙ্গে বাণিজ্য চালানো দেশগুলির উপর চাপ তৈরির লক্ষ্যেই এই আইন আনা হয়েছিল। হোয়াইট হাউসের সরকারি নথিতে আইনটির স্বাক্ষরের তারিখ ও বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

এই আইনে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি করা বড় ক্রেতা দেশগুলির পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতা রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি রাশিয়ার উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করা দেশগুলির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান ছিল।

কিন্তু আইনের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে কিছু বিধান থেকে ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেই ১৬ অক্টোবরের নির্দেশে একাধিক শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধের প্রয়োগ স্থগিত করেন ট্রাম্প। নির্দেশে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তারা ফের পদক্ষেপ করতে পারবেন।

ভারত দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করে আসছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং দেশের জ্বালানি চাহিদা—এই বিষয়গুলির সঙ্গে আমদানির সিদ্ধান্ত সরাসরি যুক্ত। রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতীয় পণ্যের উপর নতুন করে ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানো হলে আমেরিকার বাজারে ভারতীয় রফতানিকারকদের খরচ ও প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি প্রভাবিত হতে পারত।

শুল্কের এমন বৃদ্ধি কার্যকর হলে আমেরিকায় পণ্য পাঠানো সংস্থাগুলিকে বাড়তি খরচের মুখে পড়তে হতে পারত। সেই খরচের প্রভাব পণ্যের দাম, ক্রেতাদের চাহিদা এবং ব্যবসায়িক মুনাফাতেও পড়ার আশঙ্কা ছিল। তাই নতুন শুল্কের বিধান স্থগিত হওয়ার সিদ্ধান্ত ভারতীয় রফতানিকারকদের জন্য আপাতত গুরুত্বপূর্ণ।

একইভাবে চিনও রাশিয়ার জ্বালানির বড় ক্রেতা হওয়ায় এই সিদ্ধান্তের প্রভাব সেই দেশের বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে। তবে ভারত ও চিনের ক্ষেত্রে ঠিক কতটা আর্থিক প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী মার্কিন সিদ্ধান্ত, বিদ্যমান শুল্কের কাঠামো এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিস্থিতির উপর।

নির্বাহী নির্দেশে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার নির্দিষ্ট বিধান থেকে ছাড় দেওয়া আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের অনুকূল। তবে নির্দেশনামায় সব সিদ্ধান্তের পিছনে বিস্তারিত কূটনৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে শুধুমাত্র ভারতকে স্বস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য সরকারি নথিতে নেই।

অন্যদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সংক্রান্ত সমঝোতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তির দামের চাপ নিয়েও মার্কিন নীতিতে আলোচনা চলছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন শুল্ক কার্যকরের আগে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্তকে বাণিজ্য ও জ্বালানি নীতির গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সিদ্ধান্তের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য আরও সরকারি ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ট্রাম্পের নির্দেশে নতুন আইনের আওতায় থাকা নির্দিষ্ট শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগ স্থগিত হয়েছে। কিন্তু এই ছাড় অনির্দিষ্টকালের জন্য অপরিবর্তিত থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নির্দেশ অনুযায়ী, পরিস্থিতি বিবেচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে নতুন পদক্ষেপ করতে পারেন।

তাই ভারতের জন্য এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক স্বস্তির হলেও, রাশিয়া থেকে তেল আমদানি এবং আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরবর্তী নীতিগত পরিবর্তনের দিকে নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে নতুন শুল্কের বিধান ফের কার্যকর হয় কি না এবং দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনায় কী অগ্রগতি হয়, তার উপর ভবিষ্যতের পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।

রুশ তেল কেনা দেশগুলির উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের বিধান স্থগিত করে ট্রাম্প আপাতত বড় বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা কমিয়েছেন। তবে এই সিদ্ধান্তকে ভারতের উপর থাকা সব মার্কিন শুল্ক প্রত্যাহার বলে ধরে নেওয়া যাবে না। পরবর্তী সরকারি নির্দেশ ও বাণিজ্যিক আলোচনাই ঠিক করবে এই স্বস্তি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

Advertisementspot_img

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর