আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের আর্থিক দুর্নীতি মামলায় প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে জামিন দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। দীর্ঘদিন বন্দি থাকা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির বিষয়টি বিবেচনা করে ১৫ অক্টোবর তাঁর আবেদন মঞ্জুর করে বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ ও বিচারপতি প্রসন্ন বি ভারালের বেঞ্চ। এই সিদ্ধান্তের পর ফের আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আর জি করের নির্যাতিতার বাবা শেখর দেবনাথ। তাঁর বক্তব্য, বিচার না পাওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে।
প্রদত্ত প্রতিবেদনে নির্যাতিতার বাবার বক্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে, প্রয়োজনে আবার রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হবে। রাজ্যে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, মেয়ের বিচার চাওয়ার প্রশ্নে কোনও আপস করবেন না বলেও জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, সন্দীপ ঘোষের জামিনের পর বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ নতুন করে সামনে এসেছে।
তবে এই জামিন আর জি করের চিকিৎসক-ছাত্রীকে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় নতুন করে জামিন দেওয়ার ঘটনা নয়। সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তটি আর্থিক দুর্নীতি সংক্রান্ত পৃথক মামলার। দুই মামলার আইনি অবস্থান আলাদা করে দেখা জরুরি।
সন্দীপ ঘোষের জামিনের আবেদনের শুনানিতে বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তিনি দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্দি রয়েছেন। অথচ মামলায় ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র সাতজনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পূর্ণ হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন বিচারাধীন অবস্থায় বন্দি থাকার বিষয়টি বিবেচনা করে কলকাতা হাই কোর্টের ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জামিন খারিজের নির্দেশ বাতিল করে শীর্ষ আদালত। তাঁর জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট ট্রায়াল কোর্টের নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে।
আদালতের এই সিদ্ধান্তের অর্থ অবশ্য এই নয় যে সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ খারিজ হয়ে গিয়েছে। জামিনের প্রশ্ন এবং মামলার চূড়ান্ত বিচার পৃথক বিষয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য বিচারপ্রক্রিয়া চলবে।
২০২৪ সালের অগস্টে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে এক চিকিৎসক-ছাত্রীর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা সামনে আসার পর হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেই সময় হাসপাতালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও সামনে আসে।
তদন্তে হাসপাতালের আর্থিক লেনদেন ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়। সিবিআইয়ের মামলায় আর্থিক দুর্নীতির পাশাপাশি মেধাতালিকার নম্বর নিয়ে কারচুপির অভিযোগও রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অভিযোগগুলির বিচার এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।
সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের পর চার্জশিটও জমা পড়ে। তাঁর জামিনের আবেদন প্রথমে নিম্ন আদালত ও কলকাতা হাই কোর্টে খারিজ হয়েছিল। পরে সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন তিনি।
এই মামলায় ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র সাতজনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পূর্ণ হওয়ার বিষয়টি জামিনের শুনানিতে বিশেষ গুরুত্ব পায়। দীর্ঘদিন বন্দি থাকার পরও বিচারপ্রক্রিয়া কতটা এগিয়েছে, তা নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ সামনে এসেছে।
ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর হলেও বিচারাধীন অবস্থায় দীর্ঘদিন বন্দি থাকা এবং বিচার শেষ হতে কতটা সময় লাগতে পারে, সেগুলিও জামিন বিবেচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এই মামলায় শীর্ষ আদালত বন্দিদশার মেয়াদ এবং সাক্ষ্যগ্রহণের অগ্রগতিকে গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে জামিন মঞ্জুর হওয়ার ফলে মামলার সমস্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। আদালতের নির্ধারিত শর্ত মেনে চলার পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ায় পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
সন্দীপ ঘোষের জামিনের পর নির্যাতিতার বাবার প্রতিক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রদত্ত প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য, প্রয়োজন হলে আবার আন্দোলনে নামবেন তিনি। বিচার পাওয়ার জন্য যে পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা করতে পিছপা হবেন না বলেও জানিয়েছেন।
বর্তমানে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গও উঠেছে। নির্যাতিতার মা রত্না দেবনাথ বিজেপির বিধায়ক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে আন্দোলন হলে তা রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে নির্যাতিতার বাবা জানিয়েছেন, সরকারে কোন দল রয়েছে, তা তাঁর কাছে বিচার চাওয়ার পথে বাধা হতে পারে না।
তবে পরিবারের ভবিষ্যৎ আন্দোলনের নির্দিষ্ট তারিখ, স্থান বা কর্মসূচি এখনও এই প্রতিবেদনে জানানো হয়নি। তাঁর বক্তব্য থেকে আপাতত স্পষ্ট, মামলার অগ্রগতি নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ রয়েছে এবং বিচার চাওয়ার দাবিতে তাঁরা সরব থাকতে চান।
সন্দীপ ঘোষের জামিনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আর্থিক দুর্নীতি মামলার বিচারপ্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়। ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে বাকি সাক্ষ্যগ্রহণ, আদালতের নির্ধারিত জামিনের শর্ত এবং মামলার পরবর্তী শুনানির দিকে নজর থাকবে।
একই সঙ্গে নির্যাতিতার পরিবার ফের কোনও আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে জামিনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি বা নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার সমান বলে দেখা যাবে না।
আর জি কর কাণ্ডে বিচার ও জবাবদিহির দাবি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। সন্দীপ ঘোষের জামিনের পর সেই দাবি ঘিরে পরিবারের অবস্থান ফের সামনে এল। আগামী দিনে আদালতের কার্যক্রম এবং পরিবারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য থেকেই পরবর্তী পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।




