‘পুরো ব্যবস্থাকে উপহাস’! প্রশান্ত বর্মনের আর্জি খারিজ সুপ্রিম কোর্টে, রাজ্যকেও দ্রুত পদক্ষেপের নির্দেশ

স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যা অপহরণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্ত প্রশান্ত বর্মনের আবেদন খারিজ সুপ্রিম কোর্টে। কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ কার্যকর করতে রাজ্যকে পদক্ষেপের নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যার অপহরণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্ত প্রাক্তন বিডিও প্রশান্ত বর্মনকে ঘিরে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশের পরেও আত্মসমর্পণ না করার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। হাই কোর্টের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে পুলিশের কাছে ধরা না দিয়ে শীর্ষ আদালতে আবেদন করেছিলেন প্রশান্ত। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি মিলল না। তাঁর আর্জি খারিজ করে বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, একজন ব্যক্তি গোটা ব্যবস্থাকে উপহাস করছেন। একই সঙ্গে প্রশান্তকে গ্রেফতারের ক্ষেত্রে রাজ্যের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত।

মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অরবিন্দ কুমার এবং বিচারপতি বিপুল মনুভাই পঞ্চোলীর বেঞ্চে মামলাটি ওঠে। প্রশান্তের আইনজীবীর কাছে বিচারপতিরা জানতে চান, এর আগে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও তাঁর মক্কেল কেন এখনও আদালতের নির্দেশ পালন করেননি। আদালতের পর্যবেক্ষণ, নির্দেশ অমান্য করে এ ভাবে দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের নাগালের বাইরে থাকা নিয়ে তারা বিস্মিত। হাই কোর্টের নির্দেশে হস্তক্ষেপ করতেও রাজি হয়নি শীর্ষ আদালত।

রাজ্যের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিচারপতিরা। তাঁদের প্রশ্ন, অভিযুক্তকে খুঁজে বের করতে এবং আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে প্রশাসন কী পদক্ষেপ করেছে? রাজ্যকে অবিলম্বে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ মেনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায় সুপ্রিম কোর্ট। ফলে আত্মসমর্পণ এড়িয়ে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েও আপাতত কোনও রক্ষাকবচ পেলেন না প্রশান্ত।

গত ৬ অক্টোবর কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগে এবং বিচারপতি ওম নারায়ণ রাইয়ের ডিভিশন বেঞ্চ প্রশান্তকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিল। সময়সীমা ছিল ৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টে পর্যন্ত। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি আত্মসমর্পণ করেননি। বরং ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন। হাই কোর্ট জানিয়েছিল, নির্দেশ পালন না করলে তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। পাশাপাশি অবিলম্বে তাঁর বেতন বন্ধ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।

প্রশান্ত বর্মন জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জের প্রাক্তন ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক (BDO)। সল্টলেকের দত্তাবাদ এলাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যার অপহরণ ও খুনের ঘটনায় তাঁর নাম জড়িয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ এবং মামলার নথি অনুযায়ী, এই ঘটনায় প্রশান্ত অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দোষী বলা যায় না। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব বর্তমানে রাজ্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (CID)-এর হাতে।

এই মামলায় আগেও একাধিকবার আদালতের নির্দেশের মুখে পড়েছেন প্রশান্ত। নিম্ন আদালত থেকে আগাম জামিন পাওয়ার পর বিধাননগর পুলিশ তার বিরোধিতা করে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। হাই কোর্ট সেই জামিনের নির্দেশ খারিজ করে প্রশান্তকে আত্মসমর্পণ করতে বলে। পরে ২৩ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টও তাঁকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশের পরেও তিনি আত্মসমর্পণ করেননি বলে আদালতে জানানো হয়।

প্রশান্তকে খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী সিআইডি ও রাজ্যকে প্রশ্ন করেছিলেন। গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে কেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন বিচারপতি। একই সঙ্গে অভিযুক্তের বেতন চালু থাকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর পরেই ৬ অক্টোবরের শুনানিতে আত্মসমর্পণের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার হুঁশিয়ারি দেয় প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ।

এর আগে গত ২৫ মে নিউ টাউনের ইকো পার্ক থানা এলাকায় একটি পথদুর্ঘটনার পর প্রশান্তকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। অভিযোগ ছিল, তাঁর গাড়ির ধাক্কায় এক পথচারী আহত হন এবং গাড়ি চালানোর সময় তিনি মত্ত ছিলেন। পরের দিন তাঁকে বারাসত আদালতে হাজির করানো হয়। কিন্তু স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের মামলার প্রয়োজনীয় নথি সময়মতো আদালতে পৌঁছয়নি বলে অভিযোগ। সেই কারণে ওই মামলায় তাঁকে হেফাজতে নেওয়া যায়নি এবং তিনি জামিনে মুক্ত হন। তার পর থেকে ফের তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না বলে তদন্তকারী সংস্থার তরফে জানানো হয়েছিল।

প্রশান্তের বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত এবং তাঁকে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী হাজির করানোর বিষয়টি এখন রাজ্য প্রশাসন ও সিআইডির কাছে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশের পর হাই কোর্টের নির্দেশ কার্যকর করতে রাজ্য কী পদক্ষেপ করে, সেদিকেই নজর রয়েছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

Advertisementspot_img

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর