চোরবাগান দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকারের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT)। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর সিটের প্রধান, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী জানান, প্রতিমা নিরঞ্জনে বাধা নেই। তবে তদন্তের স্বার্থে দুর্ঘটনার সময় মণ্ডপের যে অবস্থা ছিল, তা হুবহু বজায় রাখতে হবে। পরিদর্শনে মণ্ডপের ভিতরে কম আলো এবং প্রবেশ ও বেরনোর সরু রাস্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিট নাগাদ চোরবাগানের মণ্ডপে পৌঁছয় সিটের সদস্যরা। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আইপিএস আধিকারিক জাভেদ শামিম-সহ তদন্তকারী দলের অন্য সদস্যেরা। মণ্ডপের ভিতর ও বাইরের অংশ ঘুরে দেখেন তাঁরা। প্রবেশপথ, নির্গমনপথ, আলো এবং মণ্ডপের সামগ্রিক কাঠামো খতিয়ে দেখার পাশাপাশি ঘটনাস্থলের ভিডিয়োও করা হয়।
পরিদর্শনের পর অনিন্দিতা রায় সরস্বতী জানান, প্রতিমা নিরঞ্জনে কোনও বাধা নেই। কিন্তু মণ্ডপের কোনও অংশ সরানো বা বদলানো যাবে না। দুর্ঘটনার সময় মণ্ডপের যে বিন্যাস ছিল, তদন্তের প্রয়োজনে তা একই রাখতে হবে। ফলে প্রতিমা নিরঞ্জন হলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মণ্ডপের কাঠামো অক্ষত রাখার নির্দেশ থাকছে।
ঘটনার পর থেকেই মণ্ডপে পর্যাপ্ত আলো ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পরিদর্শনের সময় আলো পরীক্ষা করে সিটের প্রধান জানান, দুর্ঘটনার সময় যেমন আলো ছিল, এখনও তেমনই রাখা হয়েছে এবং আলো যথেষ্ট কম। মণ্ডপের প্রবেশ ও বেরনোর পথও অত্যন্ত সরু বলে পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। ওই সীমিত জায়গায় বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে থাকতে পারে বলে তাঁর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ। তবে চূড়ান্ত কারণ জানতে তদন্ত চলবে।
অনিন্দিতার বক্তব্য অনুযায়ী, পদপিষ্টের ঘটনা মণ্ডপের ভিতরে নয়, নির্গমন গেটের ঠিক বাইরের অংশে ঘটেছিল। ঠিক কীভাবে সেখানে ভিড় জমল, মানুষের চলাচল কোন পর্যায়ে বাধাপ্রাপ্ত হল এবং কী কারণে হুড়োহুড়ি শুরু হল, তা তদন্ত করে দেখা হবে। মণ্ডপের নকশা ও সাজসজ্জার সঙ্গে যুক্ত শিল্পী থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
চোরবাগান পদপিষ্ট-কাণ্ডে কলকাতা পুলিশ ও কলকাতা পুরসভার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সিটের তদন্তে কোনও সংস্থাকে আগাম দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না। পুজো উদ্যোক্তা, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলির ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে। মণ্ডপে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল কি না, ক্যামেরায় কী ধরা পড়েছে এবং সেই ফুটেজ থেকে ঘটনার ধারাবাহিকতা বোঝা সম্ভব কি না, তা-ও যাচাই করা হবে।
দুর্ঘটনার সময় মাইকে ঘোষণা করা হয়েছিল, মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি, ওই ঘোষণার পর দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায় এবং দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে হুড়োহুড়ি বেড়ে যায়। ঘোষণাটি কে বা কারা করেছিলেন, কেন সেই বার্তা দেওয়া হয়েছিল এবং তার ফলে ভিড়ের গতিপথে কী পরিবর্তন এসেছিল, তা খতিয়ে দেখবে সিট। ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় থাকবে।
১৭ অক্টোবরের ওই ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু এবং বহু মানুষের আহত হওয়ার পর চোরবাগান মণ্ডপ এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। তাই প্রতিমা নিরঞ্জনের অনুমতি মিললেও ঘটনাস্থলের প্রমাণ সংরক্ষণে কোনও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। মণ্ডপের বিন্যাস, আলোর অবস্থা, সরু পথ এবং জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থার সঙ্গে দুর্ঘটনার যোগ ছিল কি না, সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজেই দায় নির্ধারণ করতে চায় তদন্তকারী দল।



