বাঙালির ঘরে লক্ষ্মীপুজো মানেই আলপনা, ধূপ-প্রদীপ, ধান-দুর্বা, নৈবেদ্য আর পুজোর শেষে লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ। কোজাগরী পূর্ণিমায় হোক কিংবা বছরের অন্যান্য বৃহস্পতিবারে, বহু বাঙালি পরিবারে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই প্রাচীন লোকাচার। পাঁচালির ছন্দে শোনা যায় দেবীর মাহাত্ম্য, লক্ষ্মীব্রতের কাহিনি এবং সংসারে সদাচার, সংযম ও শান্তির গুরুত্বের কথা।
কিন্তু লক্ষ্মীর পাঁচালি আসলে কী? কেন পুজোর পরে এটি পাঠ করা হয়? পাঁচালিতে কোন কাহিনি বলা হয়েছে এবং কীভাবেই বা এই পাঠের রীতি গড়ে উঠেছে? ধর্মীয় বিশ্বাস ও বাংলার লোকসংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লক্ষ্মীর পাঁচালির নানা দিক জেনে নেওয়া যাক।
লক্ষ্মীর পাঁচালি কী?
বাংলা লোকসাহিত্যে ‘পাঁচালি’ বলতে সাধারণত ছন্দে বা সুর করে পাঠ করা কাহিনিমূলক রচনাকে বোঝায়। ধর্মীয় আচার, ব্রত এবং দেবদেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনার ক্ষেত্রে বাংলায় পাঁচালি পাঠের দীর্ঘ প্রচলন রয়েছে। লক্ষ্মীর পাঁচালিও সেই ধারার একটি পরিচিত উদাহরণ।
লক্ষ্মীর পাঁচালিতে দেবী লক্ষ্মীর মাহাত্ম্য, লক্ষ্মীব্রত পালনের কথা এবং দেবীর কৃপায় দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার কাহিনি বর্ণিত হয়। এর বিভিন্ন মুদ্রিত সংস্করণ ও প্রচলিত পাঠে শব্দ, বর্ণনা এবং কিছু ঘটনার পার্থক্য থাকতে পারে। পাঁচালিটির আদি রচয়িতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য, সর্বসম্মত তথ্যও সহজলভ্য নয়। তাই একে নির্দিষ্ট কোনও একক লেখকের রচনা বলে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করার পরিবর্তে বাংলার প্রচলিত ব্রতসাহিত্যের অংশ হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।
[কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ২০২৬ কবে ও কখন? জেনে নিন পূর্ণিমার তিথি, শুভ সময় ও পুজোর সম্পূর্ণ পদ্ধতি]
বাঙালি হিন্দু পরিবারের বহু বাড়িতে প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীর পুজোর পরে পাঁচালি পাঠ করা হয়। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোতেও পুজোর সঙ্গে পাঁচালি বা ব্রতকথা পাঠের রীতি প্রচলিত। তবে পরিবারের রীতি, অঞ্চল এবং ব্যবহৃত পুজোর বই অনুযায়ী পাঠের ধরন আলাদা হতে পারে।
লক্ষ্মীর পাঁচালি কেন পাঠ করা হয়?
লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠের মূল উদ্দেশ্য দেবীর আরাধনা, তাঁর মাহাত্ম্য স্মরণ এবং পরিবারের মঙ্গল কামনা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী লক্ষ্মী ধন-সম্পদ, শস্য, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক। তাই বহু পরিবারে পাঁচালি পাঠের মাধ্যমে সংসারে শান্তি, সুস্থতা ও আর্থিক সচ্ছলতার জন্য প্রার্থনা করা হয়।
তবে পাঁচালি পাঠ করলেই ঋণ দূর হবে, অর্থসম্পদ বাড়বে কিংবা কোনও নির্দিষ্ট মনোবাসনা পূরণ হবেই—এমন দাবিকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে দেখা যায় না। এগুলি ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচারের অংশ। পাঁচালি পাঠের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষা, একসঙ্গে উপাসনা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচলিত কাহিনি ও মূল্যবোধকে বাঁচিয়ে রাখার মধ্যেও।
লক্ষ্মীর পাঁচালির প্রচলিত কাহিনিতে শুধু সম্পদের আকাঙ্ক্ষা নয়, মানুষের আচরণ, পারিবারিক সম্পর্ক, দায়িত্ববোধ এবং সংসারে শান্তি বজায় রাখার কথাও উঠে আসে। এই কারণেই পাঁচালি অনেক পরিবারের কাছে কেবল ধর্মীয় পাঠ নয়, ঘরের পরিচিত সাংস্কৃতিক অভ্যাসও।
লক্ষ্মীর পাঁচালির প্রচলিত কাহিনি কী?
লক্ষ্মীর পাঁচালির বিভিন্ন প্রচলিত সংস্করণে দেবী লক্ষ্মীর মাহাত্ম্য বোঝাতে একাধিক ঘটনা বর্ণিত হয়। বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মীব্রতকে কেন্দ্র করে প্রচলিত একটি পরিচিত কাহিনিতে নারদ মুনি মর্ত্যের মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা নারায়ণের কাছে তুলে ধরেন। এরপর দেবী লক্ষ্মীর ব্রত ও আরাধনার কথা মর্ত্যে প্রচারের প্রসঙ্গ আসে।
কাহিনির আরেকটি পরিচিত অংশে অবন্তী নগরের এক ধনী বণিকের পরিবারকে কেন্দ্র করে ঘটনা এগোয়। বণিকের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারে সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ, অশান্তি ও দুর্দশা দেখা দেয়। পরিবারের এক প্রবীণ নারী হতাশ হয়ে পড়লে, প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, দেবী লক্ষ্মী তাঁকে ব্রত পালনের পথ দেখান। পরে পরিবারের সদস্যরা লক্ষ্মীব্রত পালন করেন এবং সংসারে শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসে—এমন বর্ণনা পাওয়া যায়।
এই আখ্যানের মূল বক্তব্য হিসেবে সাধারণত ভক্তি, সদাচার, পারিবারিক শান্তি এবং দেবীর প্রতি আস্থার কথা তুলে ধরা হয়। তবে মনে রাখা জরুরি, এটি ধর্মীয় ব্রতকথা ও লোকবিশ্বাসের বর্ণনা; ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে একে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। বিভিন্ন পাঁচালির বইয়ে কাহিনির বিবরণে পার্থক্যও থাকতে পারে।
লক্ষ্মীর পাঁচালি কখন পাঠ করা হয়?
বাংলার বহু পরিবারে প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুজোর পরে পাঁচালি পাঠ করা হয়। আবার কোজাগরী পূর্ণিমায় দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার পরেও পাঁচালি বা ব্রতকথা পাঠের রীতি রয়েছে।
সাধারণত পুজোর উপকরণ সাজানো, দেবীর আরাধনা, ফুল ও নৈবেদ্য নিবেদন এবং প্রণামের পর পরিবারের কোনও সদস্য পাঁচালি পাঠ করেন। অন্যরা মন দিয়ে শোনেন। কোনও কোনও পরিবারে পাঠের সময় হাতে দুর্বা রাখার রীতিও রয়েছে। তবে এই নিয়ম সর্বত্র এক নয়।
পাঁচালি পাঠের জন্য আলাদা কোনও সর্বজনীন সময়সীমা নেই। বইয়ের দৈর্ঘ্য, পাঠের গতি এবং পরিবারের প্রচলিত রীতির ওপর সময় নির্ভর করে। পুজোর নির্দিষ্ট বিধি অনুসরণ করতে চাইলে নিজের পরিবারের ব্যবহৃত পুজোর বই বা পুরোহিতের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠের প্রচলিত নিয়ম
লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠের পদ্ধতি পরিবার ও অঞ্চলভেদে বদলাতে পারে। সাধারণভাবে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা হয়।
প্রথমে পুজোর জায়গা পরিষ্কার করে দেবী লক্ষ্মীর প্রতিমা, ছবি, সরা অথবা ঘট প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর ফুল, ধূপ, প্রদীপ, ধান, দুর্বা, ফল ও নৈবেদ্য দিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়। পুজোর শেষে পরিবারের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রণাম করে লক্ষ্মীর পাঁচালি বা ব্রতকথা পাঠ করা হয়।
অনেক বাড়িতে একজন পাঁচালি পাঠ করেন এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা তা শোনেন। কোথাও শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনির মাধ্যমে পুজোর পর্ব সম্পন্ন হয়। আবার কিছু পরিবারে পাঠ শেষে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। এগুলি বাংলার প্রচলিত লোকাচারের অংশ; সব বাড়িতে প্রতিটি নিয়ম একইভাবে পালিত হয় না।
পাঁচালি পাঠের সময় শব্দগুলি স্পষ্টভাবে পড়া এবং কাহিনির অর্থ বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। পুরোনো পাঁচালিতে কিছু শব্দ আধুনিক বাংলায় অপরিচিত মনে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যাসহ সংস্করণ ব্যবহার করলে পাঠের অর্থ বুঝতে সুবিধা হয়।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় পাঁচালির গুরুত্ব
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিকে কেন্দ্র করে পালিত হয়। এই পুজোয় দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার সঙ্গে আলপনা, প্রদীপ, নৈবেদ্য এবং পাঁচালি পাঠ বহু বাঙালি পরিবারের পরিচিত ঐতিহ্য।
‘কোজাগরী’ শব্দের সঙ্গে প্রচলিত ‘কো জাগর্তি’—অর্থাৎ, ‘কে জেগে আছ?’—ব্যাখ্যাটি যুক্ত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী জেগে থাকা ভক্তদের আশীর্বাদ করেন। সেই বিশ্বাসের সূত্রেই কোথাও কোথাও রাত জেগে উপাসনা, নামগান বা পাঁচালি পাঠের রীতি দেখা যায়।
তবে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো এবং বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মীব্রতের পাঁচালি একেবারে একই আচার—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। পরিবারভেদে কোজাগরীর জন্য নির্দিষ্ট ব্রতকথা পাঠ করা হয়, আবার কেউ বৃহস্পতিবারের প্রচলিত লক্ষ্মীর পাঁচালিও পড়েন। নিজের বাড়ির রীতি বা পঞ্জিকার নির্দেশ অনুসরণ করাই শ্রেয়।
লক্ষ্মীর পাঁচালি কি শুধু মহিলারাই পাঠ করেন?
বাংলার বহু পরিবারে লক্ষ্মীব্রত ও পাঁচালি পাঠের দায়িত্ব ঐতিহ্যগতভাবে বাড়ির মহিলারা পালন করে আসছেন। এই কারণে পাঁচালি পাঠের সঙ্গে নারীদের গৃহস্থালি ও পারিবারিক ধর্মাচারের একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তবে এটি সর্বজনীন নিয়ম নয়। পরিবার ও ব্যক্তিগত বিশ্বাস অনুযায়ী অন্য সদস্যরাও পাঁচালি পাঠ করতে বা শুনতে পারেন।
পাঁচালির কিছু প্রচলিত কাহিনিতে গৃহস্থালির কাজ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং নারীর আচরণ নিয়ে নির্দিষ্ট সামাজিক প্রত্যাশার প্রতিফলনও দেখা যায়। এগুলিকে বাংলার অতীতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের অংশ হিসেবে পড়া যায়। একই সঙ্গে বর্তমান সময়ে পাঠকরা সেই বক্তব্যকে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধের আলোকে বিচার করতে পারেন।
লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ না করলে কি পুজো অসম্পূর্ণ?
অনেক পরিবারে পাঁচালি পাঠকে লক্ষ্মীপুজোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। তাঁদের কাছে পুজোর পরে পাঁচালি পাঠ করা দীর্ঘদিনের পারিবারিক ঐতিহ্য। কিন্তু পাঁচালি পাঠ না করলে অবশ্যই অমঙ্গল হবে বা পুজো গ্রহণযোগ্য হবে না—এমন কোনও সর্বজনীন নিয়মের দাবি করার ভিত্তি নেই।
ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে পরিবার, অঞ্চল ও সম্প্রদায়ভেদে ভিন্নতা রয়েছে। কেউ পাঁচালি পাঠ করেন, কেউ ব্রতকথা শোনেন, আবার কেউ মন্ত্র, প্রার্থনা ও প্রণামের মাধ্যমে দেবীর আরাধনা করেন। নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় বিধি অনুসরণ করতে চাইলে নিজের পুজোর বই বা পুরোহিতের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লক্ষ্মীর পাঁচালির দীর্ঘস্থায়ী গুরুত্ব তাই শুধু একটি ধর্মীয় নিয়মে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বাংলার লোকসাহিত্য, পারিবারিক স্মৃতি এবং প্রজন্মান্তরে চলে আসা উপাসনার রীতির সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে। পাঁচালির কাহিনি পাঠ করতে গিয়ে ভক্তরা যেমন দেবী লক্ষ্মীর কাছে মঙ্গল কামনা করেন, তেমনই বহু পরিবারে এই পাঠ একসঙ্গে বসার এবং ঐতিহ্যকে ধরে রাখার উপলক্ষ হয়ে ওঠে।



