কলকাতা ও শহরতলিতে বিজেপির শূন্যতা—এই বাস্তবতাকেই হাতিয়ার করে কর্মীদের উপর চাপ বাড়িয়ে দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বছরের শেষ দিনে মহানগরের বিজেপি নেতা-কর্মীদের স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, চারটি সাংগঠনিক জেলায় থাকা ২৮টি বিধানসভা আসনের মধ্যে অন্তত ২০টিতেই জয়ের লক্ষ্য নিয়ে ঝাঁপাতে হবে। বাস্তব পরিসংখ্যান যতই প্রতিকূল হোক, লক্ষ্য কমানোর কোনও প্রশ্ন নেই—সায়েন্স সিটির সভা থেকে এই বার্তাই দিয়ে দিল্লি ফিরে গেলেন শাহ।
বুধবার দুপুরে সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘মহানগর কর্মী সম্মেলন’-এ উত্তর কলকাতা, দক্ষিণ কলকাতা, দমদম ও যাদবপুর সাংগঠনিক জেলার বিজেপি নেতা-কর্মীরা হাজির ছিলেন। শক্তিকেন্দ্র স্তর থেকে শুরু করে মণ্ডল ও জেলা নেতৃত্ব—সকলকেই ডাকা হয়েছিল। শুরুতে বিজেপির এই কর্মসূচি সমাজমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হলেও শাহ মঞ্চে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। দলের অন্দরে ধারণা, কলকাতা-কেন্দ্রিক যে কঠিন রাজনৈতিক বার্তা শাহ দিতে চলেছেন, তা প্রকাশ্যে ছড়িয়ে পড়ুক—চাননি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।


সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শাহ প্রথমে স্মরণ করিয়ে দেন, মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে কী ভাবে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে তিনটি বিধানসভা আসন থেকে ৭৭-এ এবং দু’টি লোকসভা আসন থেকে ১৮টিতে পৌঁছেছিল। এমনকি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আসন কমলেও ২০২১ সালের তুলনায় ভোট শতাংশ যে বেড়েছে, সেটিও তুলে ধরেন। কিন্তু কলকাতা ও শহরতলির প্রসঙ্গে এসে সুর বদলান। স্পষ্ট করে বলেন, এই অঞ্চলে বিজেপির হাতে এখনও কোনও বিধানসভা আসন নেই—এই বাস্তবতা বদলাতেই হবে।
চারটি সাংগঠনিক জেলার চারটি লোকসভা কেন্দ্র মিলিয়ে মোট ২৮টি বিধানসভা আসন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকো ও শ্যামপুকুরে বিজেপি এগিয়ে থাকলেও বাকি ২৬টি আসনেই পিছিয়ে ছিল। অর্থাৎ সর্বশেষ নির্বাচনে ফলাফল কার্যত তৃণমূল ২৬, বিজেপি ২। সেই বাস্তবতার মধ্যেই শাহের ঘোষণা—২০টি আসন জয়ের লক্ষ্য।
এই টার্গেট ঘিরে কলকাতার বিজেপি নেতাদের মধ্যেই শুরু হয়েছে হিসেবনিকেশ। দলের একাংশের যুক্তি, লোকসভা নির্বাচনের ফল দেখেই বিজেপির সম্ভাবনা বিচার করা ঠিক নয়। মানিকতলা, ভবানীপুর, রাসবিহারী, রাজারহাট-গোপালপুর বা সোনারপুর দক্ষিণের মতো একাধিক বিধানসভা কেন্দ্রে অতীতে বিজেপি এগিয়ে থেকেছে। দমদম লোকসভা কেন্দ্রে তপন শিকদারের দু’বার জয়ের ইতিহাসও তুলে ধরছেন তাঁরা। তবে বাস্তব হিসেব বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপি যেখানে এগিয়ে থেকেছে, সেই সব আসন জিতলেও সংখ্যাটা সাতের বেশি হয় না। সেখানে ২০ আসনের লক্ষ্য কার্যত ‘অসাধ্য চ্যালেঞ্জ’ বলেই মানছেন অনেকে।


সায়েন্স সিটির কর্মী সম্মেলন শেষ করে শাহ যান ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে পুজো দিতে। সেই যাত্রাপথেই কংগ্রেসের বিক্ষোভের মুখে পড়ে তাঁর সফর। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার-সহ একাধিক নেতা উপস্থিত থাকলেও পুলিশ ব্যারিকেড করে তাঁদের কনভয়ের কাছাকাছি যেতে দেয়নি। ব্যারিকেডের ভিতর থেকেই ‘বাংলা ও বাঙালি বিরোধী বিজেপি’—এই লেখা প্ল্যাকার্ড দেখিয়ে স্লোগান ওঠে, যা কার্যত তৃণমূলের রাজনৈতিক লাইনেরই প্রতিধ্বনি।
ঠনঠনিয়ায় পুজোর মধ্য দিয়েই কলকাতা সফরের ইতি টানেন অমিত শাহ। তবে যাওয়ার আগে মহানগরের বিজেপি সংগঠনের কাঁধে রেখে যান এক কঠিন বার্তা—লক্ষ্য বড়, সময় সীমিত, আর পিছিয়ে থাকার অজুহাত আর চলবে না।







