বিজয়া দশমীর দিনেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত। বিধানসভায় ফ্লোর টেস্ট হলে ২০৯ থেকে বেড়ে সমর্থনের সংখ্যা ২৭৫-এ পৌঁছবে বলে দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে প্রধান বিরোধী শিবিরের ৬৪ জন বিধায়ক তাঁর পক্ষে সমর্থন জানাতে প্রস্তুত বলে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন তিনি। এই বক্তব্যের পরেই রাজনৈতিক মহলে নতুন করে দলবদল ও বিধায়কদের সমর্থন নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।
বুধবার বরানগরে গিয়ে বামেদের স্টল নিয়ে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে এই মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য ঘিরে সিপিএম মামলা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অন্যদিকে, তৃণমূলের কালীঘাট শিবিরও বিরোধী শিবিরকে নিশানা করেছে। তবে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির এই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে অস্বীকার করেছে।
কী বললেন শুভেন্দু অধিকারী?
বরানগরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, একটি টক শোয়ে বিজেপির ১৫০ আসনে লড়ার কথা বলা হয়েছিল। তার পরেই তিনি বিজেপির ২০৯ আসনের প্রসঙ্গ তোলেন এবং দাবি করেন, বিধানসভায় ফ্লোর টেস্ট হলে সমর্থনের সংখ্যা ২৭৫-এ পৌঁছতে পারে।
কীভাবে ২০৯ থেকে সংখ্যাটি ২৭৫ হবে, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিরোধী শিবিরের ৬৪ জন বিধায়কের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর ইঙ্গিত, ওই বিধায়কেরা তাঁর পক্ষে সমর্থন জানাতে পারেন।
তবে এই মন্তব্যের সমর্থনে কোনও আনুষ্ঠানিক তালিকা বা বিধায়কদের লিখিত অবস্থানের তথ্য প্রতিবেদনে নেই। ফলে ৬৪ জন বিধায়কের সমর্থনের বিষয়টি আপাতত মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক দাবি হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
সিপিএমের হুঁশিয়ারি, মামলা করার কথা শতরূপের
মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যকে হাতিয়ার করে বিরোধী শিবিরের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে সিপিএম। দলের নেতা শতরূপ ঘোষের বক্তব্য, তাঁরা আগে থেকেই ওই শিবিরের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য তাঁদের সেই অভিযোগের পক্ষে কাজে লাগতে পারে বলে দাবি করেছেন তিনি।
শতরূপের বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধী শিবির বিজেপির নির্দেশে চলছে বলে তাঁদের অভিযোগ। এই বিষয়ে মামলা করা হলে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
তবে রাজনৈতিক অভিযোগ এবং আদালতে প্রমাণিত তথ্য এক নয়। মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের ভিত্তিতে কোনও আইনি সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে তথ্য নেই।
ঋতব্রত শিবিরের বক্তব্য, ব্যাখ্যা দিতে পারবেন মুখ্যমন্ত্রীই
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে সরাসরি বিতর্কে যেতে চায়নি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির। ওই শিবিরের বিধায়ক আখরুজ্জামান জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী কেন এমন মন্তব্য করেছেন, তার ব্যাখ্যা তিনিই দিতে পারবেন।
তাঁদের সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেছেন আখরুজ্জামান। তাঁর বক্তব্য, নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও দায়বদ্ধতার কারণেই তাঁরা কালীঘাটের শিবির থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
এর আগে ওই শিবিরের তরফে দাবি করা হয়েছিল, তাঁদের সঙ্গে ৬৫ জন বিধায়ক রয়েছেন এবং তাঁরাই প্রকৃত তৃণমূল। দল ছাড়ার কারণ হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগও তোলা হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই পুরনো রাজনৈতিক সংঘাতকে ফের সামনে এনেছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর কালীঘাটের তৃণমূল শিবিরও বিরোধী শিবিরকে আক্রমণ করেছে। দলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ অভিযোগ করেছেন, বিরোধী ভোটে জিতলেও ওই শিবিরের বিধায়কেরা বিজেপির প্রতি অনুগত।
কুণালের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, তিনি ওই বিধায়কদের বিজেপির সমর্থক হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে সিক্রেট ব্যালটে ফ্লোর টেস্ট করার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই শিবিরকে ফিরে আসার শেষ সুযোগ দিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। কুণাল ঘোষের মন্তব্যে সেই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে।
ফ্লোর টেস্ট নিয়ে এখন নজর কোথায়?
ফ্লোর টেস্টের মাধ্যমে বিধানসভায় সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা যাচাই করা হয়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ২৭৫ জনের সমর্থনের দাবি এবং ৬৪ জন বিধায়কের সম্ভাব্য সমর্থনের ইঙ্গিত থাকলেও, বাস্তবে এমন কোনও পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়েছে বলে প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ নেই।
তাই আপাতত এই ঘটনাকে রাজনৈতিক দাবি ও পাল্টা চ্যালেঞ্জের পর্ব হিসেবেই দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিধায়কেরা প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান জানান কি না, সিপিএমের ঘোষিত আইনি পদক্ষেপ এগোয় কি না এবং কোনও আনুষ্ঠানিক ফ্লোর টেস্টের উদ্যোগ নেওয়া হয় কি না—সেদিকেই নজর থাকবে।



