চোরবাগান পুজো মণ্ডপে বিপর্যয়ের ঘটনায় ঘোষক বাবু মজুমদার ওরফে কালিয়া গ্রেফতার হতেই সামনে এল তাঁর স্ত্রী কোয়েলের একাধিক অভিযোগ। তাঁর দাবি, ক্লাবের কয়েক জন সদস্য নাকি তাঁর স্বামীকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত আত্মগোপন করে থাকতে বলেছিলেন। সেই পরামর্শ মেনেই কয়েক দিন আড়ালে ছিলেন কালিয়া। পরে বৃহস্পতিবার রাতে থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন বলে দাবি তাঁর স্ত্রীর। যদিও এই অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি। ঘটনার সময় মাইকে ঘোষণা করা, তার পর আত্মগোপন এবং গ্রেফতারি—সব দিকই এখন তদন্তের আওতায়।
কী দাবি কালিয়ার স্ত্রী কোয়েলের?
কোয়েলের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর স্বামী কালিয়া পেশায় অ্যাপ ক্যাব চালক। চোরবাগানের পুজো কমিটির সঙ্গে তাঁর ১৮ বছরেরও বেশি সময়ের সম্পর্ক রয়েছে। তবে সাধারণত মাইকে ঘোষণা করার দায়িত্ব তাঁর ছিল না বলে দাবি কোয়েলের। তাঁর কথায়, কালিয়া গুছিয়ে কথা বলতে পারেন না। কিন্তু বিপর্যয়ের সময় ক্লাবের তরফে তাঁকে মণ্ডপ ভেঙে যাওয়ার ঘোষণা করতে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
কোয়েলের দাবি, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে ভেবে তাঁর স্বামী ওই ঘোষণা করেছিলেন। তবে ঠিক কী পরিস্থিতিতে তাঁকে ঘোষণা করতে বলা হয়েছিল, কে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সেই সময় মণ্ডপে কী ঘটছিল, তা তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হতে পারে।
বিপর্যয়ের পর কোথায় ছিলেন কালিয়া?
কোয়েলের বয়ান অনুযায়ী, ঘটনার পর কিছুক্ষণের জন্য বাড়িতে ফিরেছিলেন কালিয়া। পরে উদ্ধারকাজে যোগ দিতে বেরিয়ে যান। সেই সময় তিনি নিজের মোবাইল ফোন বাড়িতে রেখে গিয়েছিলেন বলে দাবি তাঁর স্ত্রীর।
কোয়েল আরও জানিয়েছেন, পরদিন সকালে স্বামী তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, ক্লাবের কয়েক জন সদস্য তাঁকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশ্যে না আসার পরামর্শ দিয়েছেন। স্ত্রীর দাবি, সেই কথার পরই কালিয়া আত্মগোপন করেন। যদিও কারা তাঁকে এই পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাঁদের নাম বা পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য কোয়েলের বক্তব্যে স্পষ্ট নয়।
কোয়েলের দাবি, স্বামী কোনও অন্যায় করেননি বলে তাঁর বিশ্বাস ছিল। তাই দীর্ঘ সময় আড়ালে থাকা নিয়ে কালিয়া নিজেও অস্বস্তিতে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার রাতে থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন বলে জানিয়েছেন তিনি। এই বক্তব্যের পাশাপাশি পুলিশের তরফে আত্মসমর্পণ ও গ্রেফতারির আনুষ্ঠানিক বিবরণ যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘোষক সেন্টুর গ্রেফতারির পর দ্বিতীয় পদক্ষেপ
চোরবাগান বিপর্যয়ের পর মণ্ডপ ভেঙে পড়ার ঘোষণা কে করেছিলেন, তা জানতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার প্রথমে ঘোষক সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টুকে গ্রেফতার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ওই দিন রাতেই বাবু মজুমদার ওরফে কালিয়াকেও গ্রেফতার করা হয় বলে সূত্রের খবর।
মণ্ডপে দর্শনার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি চলার সময় মাইকে ‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে’ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। সেই ঘোষণার ফলে আতঙ্ক আরও বেড়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ঘোষণাটি কার নির্দেশে হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরিস্থিতি সম্পর্কে কতটা জানতেন, সেই প্রশ্নও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে কোনও ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা মানেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। তদন্তে সংগৃহীত তথ্য এবং আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলির আইনি অবস্থান স্পষ্ট হবে।
পুলিশি হেনস্থার অভিযোগও তুলেছেন কোয়েল
স্বামী গ্রেফতার হওয়ার পর নিজের অভিজ্ঞতা নিয়েও অভিযোগ করেছেন কোয়েল। তাঁর দাবি, গত কয়েক দিনে তাঁকে বিভিন্নভাবে হেনস্থার মুখে পড়তে হয়েছে। মুর্শিদাবাদে তাঁর বাপের বাড়িতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না বলে দাবি করেছেন তিনি। এমনকি তাঁর ভাইকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন কোয়েল।
তবে এই অভিযোগগুলির বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য বা কোনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে এগুলিকে কোয়েলের অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন। তাঁর ভাইকে কেন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল কি না এবং এই বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য কী—সেসব তথ্য সামনে এলে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে।
তদন্তে এখন কোন প্রশ্নগুলি গুরুত্বপূর্ণ?
চোরবাগান কাণ্ডে তদন্তকারীদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমত, মাইকে ঘোষণাটি ঠিক কে করেছিলেন এবং সেই সময় তাঁর কাছে কী তথ্য ছিল? দ্বিতীয়ত, ঘোষণার জন্য কোনও নির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি না? তৃতীয়ত, ঘটনার পর আত্মগোপনের পরামর্শ কে দিয়েছিলেন এবং কেন ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত আড়ালে থাকতে বলা হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে, বিপর্যয়ের সময় ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এবং ঘোষণার প্রভাবও তদন্তের অংশ হতে পারে।
কালিয়ার স্ত্রী কোয়েলের দাবি নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। তবে তাঁর বক্তব্যের সত্যতা, আত্মগোপনের পরামর্শের উৎস এবং ঘোষণার পিছনে কারও নির্দেশ ছিল কি না—এই বিষয়গুলি এখনও তদন্তসাপেক্ষ। পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও তদন্তের পরবর্তী তথ্যের অপেক্ষা থাকছে।



