কলকাতার চোরবাগান পুজো মণ্ডপে সপ্তমীর সন্ধ্যায় হুড়োহুড়ি ও বিশৃঙ্খলার ঘটনায় মাইকে বিভ্রান্তিকর ঘোষণা ঘিরে তদন্তে আরও এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করল পুলিশ। ধৃতের নাম কুশল মজুমদার। তাঁকে লালবাজারে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। এর আগে নদিয়া থেকে চোরবাগান পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টুকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ফলে ওই ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল দুই।
সপ্তমীর সন্ধ্যায় দর্শনার্থীদের ভিড়ের মধ্যে মাইকে ‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে’ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। সেই ঘোষণার জেরে আতঙ্ক আরও বেড়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ জানতে চাইছে, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ওই ঘোষণা করা হয়েছিল এবং এর পিছনে কারও নির্দেশ ছিল কি না।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, চোরবাগান কাণ্ডের তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে দুই ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টুকে বৃহস্পতিবার নদিয়া থেকে গ্রেফতার করা হয়। অন্যদিকে, দ্বিতীয় সন্দেহভাজন কুশল মজুমদারকেও এবার পাকড়াও করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, ঘটনার পর থেকেই সেন্টুর মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। তিনি গোপন জায়গা থেকে বিভিন্ন সময়ে অন্য নম্বর ব্যবহার করে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন বলে পুলিশ সূত্রে খবর। সেই সূত্র ধরে সন্দেহভাজন আটটি মোবাইল নম্বরের উপর নজর রাখা হয়। এরপরই নদিয়া থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানা গিয়েছে।
সেন্টুকে শুক্রবার ব্যাঙ্কশাল আদালতে হাজির করানোর কথা ছিল বলে সূত্রের খবর। তাঁর বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগে মামলা করা হয়েছে এবং আদালতে পুলিশ কী আবেদন জানায়, তা পরবর্তী পদক্ষেপের উপর নির্ভর করবে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিয়োতে চোরবাগান মণ্ডপের বাইরে যাওয়ার পথে প্রবল ভিড় ও ঠেলাঠেলির ছবি দেখা গিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই ভিডিয়োগুলির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল।
ভিডিয়োগুলির একটিতে গ্রিল দিয়ে ঘেরা ঘোরানো উড়ালপথের উপর কয়েক জন দর্শনার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে দেখা যায়। অন্য একটি দৃশ্যে মণ্ডপ থেকে বেরোনোর গেটের কাছে কয়েক জনকে ভিড়ের চাপে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেই পরিস্থিতিতে অনেকে চিৎকার করছিলেন বলে ভিডিয়োতে শোনা যায়।
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই মাইকে ‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে’ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। ওই ঘোষণার ফলে দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বেরিয়ে যাওয়ার জন্য আরও হুড়োহুড়ি শুরু হয় বলে দাবি প্রত্যক্ষদর্শীদের। তবে ঘোষণাটিই বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
তদন্তে উঠে এসেছে, চোরবাগান মণ্ডপের বাইরে যাওয়ার পথে ক্লাব সদস্য এবং বিশেষ অতিথিদের বসার ঘর ছিল। সেখান থেকেই মাইকে ঘোষণা করার ব্যবস্থা ছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে ঠিক কারা ঘোষণা করেছিলেন, কী পরিস্থিতিতে তা করা হয়েছিল এবং ঘোষণার আগে কোনও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের তদন্তে দুই সন্দেহভাজন ঘোষকের নাম উঠে আসার পর তাঁদের গতিবিধির উপর নজর রাখা হয়েছিল বলে সূত্রের খবর। তাঁদের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় অনুসন্ধানও চালানো হয়। সেন্টু ও কুশল—দু’জনের বাড়িই অমর বসু সরণিতে, মণ্ডপ থেকে প্রায় ৫০ মিটারের মধ্যে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেফতারের পর এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন, ভিড়ের মধ্যে ওই ঘোষণা কেন করা হয়েছিল। মণ্ডপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁদের কাছে কী তথ্য ছিল, তাঁরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘোষণা করেছিলেন কি না, নাকি অন্য কারও নির্দেশে তা করেছিলেন—এই বিষয়গুলি জানতে চাইছেন তদন্তকারীরা।
তবে গ্রেফতার হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। তদন্তের ফল, পুলিশের বক্তব্য এবং আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের ভিত্তিতেই ঘটনার সম্পূর্ণ ছবি স্পষ্ট হবে।
চোরবাগান কাণ্ডে মাইকের ঘোষণা ঘিরে তদন্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে। পুলিশ দুই সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার সময়কার সিদ্ধান্ত, ঘোষণার উৎস এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে।



