দুর্গাপুজো শেষ হতেই বঙ্গোপসাগরের আবহাওয়ার দিকে নজর রাখছেন আবহাওয়াবিদরা। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে নতুন নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ঘিরে ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে সম্ভাব্য আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই নিম্নচাপ শক্তি বাড়িয়ে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হলে তার নাম হবে ‘অর্ণব’। তবে ভারতের মৌসম বিভাগ (IMD) এখনও ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়া বা নির্দিষ্ট উপকূলে আছড়ে পড়ার বিষয়ে চূড়ান্ত পূর্বাভাস দেয়নি।
মৌসম বিভাগের সামুদ্রিক আবহাওয়ার বুলেটিন অনুযায়ী, আন্দামান সাগর ও সংলগ্ন দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় একটি ঘূর্ণাবর্ত রয়েছে। এর প্রভাবে ২৩ অক্টোবরের আশপাশে দক্ষিণ-পূর্ব ও সংলগ্ন পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরি হতে পারে। এরপর সেটি পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে নিম্নচাপ তৈরি হওয়া মানেই ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়া নয়। নিম্নচাপের শক্তি, বায়ুমণ্ডলের পরিস্থিতি এবং সমুদ্রের অবস্থার উপর নির্ভর করবে সেটি কতটা শক্তিশালী হবে। আগামী কয়েক দিনের পর্যবেক্ষণ থেকেই সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ নিয়ে কী বলছে আবহাওয়ার মডেল?
বিভিন্ন আবহাওয়া মডেলে সম্ভাব্য নিম্নচাপের শক্তি বৃদ্ধি এবং গতিপথ নিয়ে একাধিক ইঙ্গিত মিলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল ফোরকাস্ট সিস্টেম (GFS) মডেলে নিম্নচাপটি শক্তিশালী হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। ইউরোপীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল ECMWF-ও অক্টোবরের শেষ দিকে সিস্টেমটির শক্তি বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। তবে দুই মডেলের সময় ও সম্ভাব্য গতিপথের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
কিছু মডেল ওড়িশা এবং উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে সিস্টেমটির এগোনোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। আবার সম্ভাব্য স্থলভাগে প্রবেশের স্থান ও সময় নিয়েও পূর্বাভাসে অমিল রয়েছে। ফলে এখনই নির্দিষ্ট কোনও উপকূলে ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়বে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
প্রাথমিক মডেল পূর্বাভাসে ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলির দিকে নজর রাখা হচ্ছে। কিন্তু সম্ভাব্য স্থলভাগে প্রবেশের স্থান নির্ভর করবে নিম্নচাপটি কীভাবে শক্তি বাড়ায় এবং কোন পথে এগোয় তার উপর। মৌসম বিভাগের সরকারি পূর্বাভাসে এখনও নির্দিষ্ট ল্যান্ডফল নিশ্চিত করা হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের আবহাওয়া দপ্তরের পরবর্তী বুলেটিনের দিকে নজর রাখা জরুরি। সম্ভাব্য দুর্যোগ নিয়ে আগাম সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রাথমিক মডেল-ভিত্তিক অনুমানকে চূড়ান্ত বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বাংলার আবহাওয়ায় কী প্রভাব পড়তে পারে?
বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ শক্তিশালী হলে পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়াতেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বাংলায় বৃষ্টি হবে কি না, কোন জেলায় তার প্রভাব বেশি থাকবে কিংবা ঝোড়ো হাওয়া বইবে কি না, তা নির্ভর করবে সিস্টেমটির চূড়ান্ত গতিপথ ও শক্তির উপর। আপাতত রাজ্যে বড়সড় প্রভাবের বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য নেই।
কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে বৃষ্টির সম্ভাবনা, উপকূলবর্তী এলাকায় হাওয়ার গতি এবং সমুদ্রের পরিস্থিতি সম্পর্কে পরবর্তী আবহাওয়া বুলেটিনে নজর রাখা প্রয়োজন। উত্তরবঙ্গের আবহাওয়ায় সম্ভাব্য সিস্টেমটির কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও নির্দিষ্ট পূর্বাভাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
কেন ঘূর্ণিঝড়ের নাম ‘অর্ণব’?
উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ হয় পূর্বনির্ধারিত তালিকা থেকে। এই নামের তালিকা তৈরি করে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (ESCAP)-এর সংশ্লিষ্ট প্যানেল। তালিকায় থাকা দেশগুলির প্রস্তাবিত নাম নির্দিষ্ট ক্রমে ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ‘অর্ণব’ নামটির অর্থ সমুদ্র বা সাগর। বঙ্গোপসাগরের এই সম্ভাব্য সিস্টেমটি ঘূর্ণিঝড়ের পর্যায়ে পৌঁছলে নির্ধারিত ক্রম অনুযায়ী এই নাম ব্যবহার করা হবে। তবে নিম্নচাপ তৈরি হওয়া মাত্রই তার নাম ঘূর্ণিঝড় হিসেবে ঘোষণা করা হয় না; সিস্টেমটিকে নির্ধারিত ঘূর্ণিঝড়ের মানদণ্ডে পৌঁছতে হবে।
অক্টোবরের শেষ দিকে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু সেটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে কি না এবং কোথায় স্থলভাগে প্রবেশ করবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তাই ‘অর্ণব’ নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে মৌসম বিভাগের সরকারি পূর্বাভাস অনুসরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কেও আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে।



