পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় জেলবন্দি রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুর (Sujit Bose) জামিনের আবেদনের শুনানি শেষ হয়েছে কলকাতা হাই কোর্টে। সোমবার বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে দীর্ঘ সওয়াল-জবাবের পর মামলার রায়দান স্থগিত রাখা হয়েছে। সুজিতের আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি (Abhishek Manu Singhvi) দাবি করেন, তদন্ত শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তাঁর মক্কেলকে জেলে আটকে রাখার কোনও যুক্তি নেই।
সুজিতের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে সিঙ্ঘভি মূলত তদন্তের বর্তমান অবস্থাকেই হাতিয়ার করেন। তাঁর বক্তব্য, পুরনিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত তদন্ত কার্যত শেষ। ফলে তদন্তের স্বার্থে সুজিত বসুকে আর হেফাজতে রাখার প্রয়োজন নেই। তিনি তদন্তে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত এবং আদালত প্রয়োজন মনে করলে যে কোনও সময়ে তাঁকে ডেকে পাঠাতে পারে।
আইনজীবীর আরও দাবি, সুজিত বসুকে এই মামলায় মূলচক্রী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে তুলে ধরেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। কিন্তু একই মামলায় সিবিআইয়ের (CBI) ২০২৪-২৫ সালের চার্জশিটে তাঁর নাম ছিল না। এই অসঙ্গতির কথাও আদালতের সামনে তুলে ধরেন সিঙ্ঘভি।
সুজিতের আইনজীবীর যুক্তি, তাঁর মক্কেলের স্থায়ী ঠিকানা কলকাতায়। ফলে জামিন পেলে তিনি পালিয়ে যাবেন বা তদন্তে সহযোগিতা করবেন না—এমন আশঙ্কারও যথেষ্ট ভিত্তি নেই। তদন্তকারী সংস্থা চাইলে তাঁকে নির্দিষ্ট শর্তে হাজির হতে বলতে পারে বলেও আদালতে জানানো হয়।
শুনানিতে সুজিতের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে জেলবন্দি রাখার বিষয়টি এখন অযৌক্তিক হয়ে উঠছে। তদন্তের প্রয়োজনীয় কাজ শেষ হওয়ার পরও কারও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সীমিত করে রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাঁর আইনজীবী।
অন্যদিকে, সুজিত বসুর বিরুদ্ধে ED-র অভিযোগও যথেষ্ট গুরুতর। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ২০১৬ সালের পুরনিয়োগ দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত একটি ঘটনায় দক্ষিণ দমদম পুরসভায় বেআইনি ভাবে চাকরির জন্য প্রার্থীদের নাম সুপারিশ করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল।
তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী, ওই তালিকায় প্রায় ১৫০ জন চাকরিপ্রার্থীর নাম ছিল। দুর্নীতির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে গিয়েছে কি না, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হয়েছে বলে ED সূত্রে জানা গিয়েছে।
এই মামলায় গ্রেফতারির আগে সুজিত বসুকে একাধিক বার জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। ভোটের আগে তাঁকে কয়েক দফায় তলব করা হলেও প্রচারের ব্যস্ততার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। পরে ১ মে সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে হাজির হন প্রাক্তন মন্ত্রী। দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর সেদিন তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
এর পর ১১ মে ফের ED দফতরে হাজিরা দেন সুজিত। প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। সেই থেকে পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় জেল হেফাজতে রয়েছেন তিনি।
সোমবারের শুনানিতে সুজিতের জামিনের পক্ষে মূল যুক্তি ছিল তদন্ত শেষ হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে হেফাজতে থাকার বিষয়টি। তবে শেষ পর্যন্ত বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ সঙ্গে সঙ্গে কোনও সিদ্ধান্ত নেননি। দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর রায়দান স্থগিত রাখা হয়েছে।
ফলে আপাতত জেলেই থাকতে হচ্ছে প্রাক্তন মন্ত্রীকে। সুজিত বসু জামিন পাবেন কি না, তা এখন নির্ভর করছে কলকাতা হাই কোর্টের পরবর্তী নির্দেশের উপর। পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ED-র অভিযোগ এবং সিবিআইয়ের চার্জশিটে তাঁর নাম না থাকার বিষয়টি আদালত কী ভাবে মূল্যায়ন করে, সেটাই হতে চলেছে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ দিক।



