‘ফিরে আসুন, শিল্পে ভরিয়ে দেব’, জঙ্গলমহলের পরিযায়ী শ্রমিকদের বড় বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

পুরুলিয়া-সহ জঙ্গলমহলের পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার বার্তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। রঘুনাথপুরে নতুন শিল্পপ্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পেটের টানে জঙ্গলমহল থেকে ভিন্‌রাজ্যে পাড়ি দেওয়া শ্রমিকদের এবার ঘরে ফেরার বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। পুরুলিয়ায় শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর বার্তা, “আপনারা ফিরে আসুন। শিল্পে ভরিয়ে দেব।” রঘুনাথপুরে নতুন শিল্পপ্রকল্প, মেজিয়ায় বিনিয়োগ এবং শিল্পাঞ্চলের পরিকাঠামো উন্নয়নের কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, স্থানীয় মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

জঙ্গলমহলের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া-সহ বিভিন্ন এলাকার বহু মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই কাজের সন্ধানে ভিন্‌রাজ্যে পাড়ি দেন। নির্মাণ, শিল্প এবং অন্যান্য অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের জন্য তাঁদের একাংশকে পরিবার ছেড়ে থাকতে হয়। এই পরিস্থিতির বদল ঘটাতে স্থানীয় স্তরেই কর্মসংস্থান তৈরির উপর জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে শিল্পায়নের সম্ভাবনার কথাও এ দিন তুলে ধরা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগম (WBIDC)-এর তথ্য অনুযায়ী, রঘুনাথপুরে প্রায় ১,৯২৪ একর জমির উপর শিল্পপার্ক গড়ে উঠছে এবং এলাকাটিকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান শিল্পকেন্দ্র হিসেবে তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে অমিত মেটালিকসের প্রস্তাবিত প্রকল্প। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রঘুনাথপুরে প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের এই প্রকল্পে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট, ফেরো অ্যালয় এবং স্পঞ্জ আয়রন-সহ একটি ইন্টিগ্রেটেড গ্রিনফিল্ড শিল্পপ্রকল্প গড়ে ওঠার কথা। সংস্থার নিজস্ব তথ্যেও রঘুনাথপুরে ১.২ মিলিয়ন টন ক্ষমতার ইন্টিগ্রেটেড স্টিল প্ল্যান্টের কাজ চলার কথা উল্লেখ রয়েছে।

প্রকল্পটি প্রায় ১৪৮ একর জমির উপর গড়ে তোলার কথা জানানো হয়েছে। সরকারের দাবি, এই শিল্পপ্রকল্প থেকে সরাসরি ও পরোক্ষ—দুই ভাবেই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে জঙ্গলমহলের স্থানীয় শ্রমিকদের কাজে যুক্ত করার বিষয়টিকে সামনে এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, অমিত মেটালিকস জঙ্গলমহলের প্রায় ১০ হাজার অদক্ষ শ্রমিককে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছে। স্থানীয় মানুষের জন্য শিল্পে কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে—এই বার্তাই বারবার দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এ নিয়ে পুরুলিয়ার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

শিল্পায়নের প্রসঙ্গে মেজিয়ার শ্যাম স্টিলের প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে এই বিনিয়োগের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে আলাদা তথ্য রয়েছে। শ্যাম মেটালিকস ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে; খড়্গপুরে প্রায় ৪,০০০ কোটি এবং জামুড়িয়ায় প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা সংস্থার তরফে প্রকাশ্যে এসেছে।

অর্থাৎ, পুরুলিয়া ও পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়নকে বিচ্ছিন্ন কোনও প্রকল্প হিসেবে না দেখে বৃহত্তর শিল্প করিডরের অংশ হিসেবেই দেখছে রাজ্য। রঘুনাথপুর-তাজপুর শিল্প ও অর্থনৈতিক করিডর তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। এই করিডরের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলগুলির পরিকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করে বেসরকারি বিনিয়োগ টানার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

রঘুনাথপুরের ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থাও শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি করছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শিল্পপার্কটি স্টেট হাইওয়ে-৫-এর সঙ্গে যুক্ত এবং NH-19 থেকে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দূরে। রেল যোগাযোগের পাশাপাশি ইস্টার্ন ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডরের কাছাকাছি অবস্থানও শিল্পাঞ্চলটির অন্যতম সুবিধা।

তবে শুধু শিল্পপ্রকল্প ঘোষণা করলেই পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরানো সম্ভব হবে না। প্রকল্প বাস্তবায়ন, সময়মতো উৎপাদন শুরু, স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ এবং স্থায়ী ও নিরাপদ কর্মসংস্থান—এই বিষয়গুলিই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে জঙ্গলমহলের কত মানুষ ভিন্‌রাজ্য থেকে নিজের এলাকায় ফিরতে আগ্রহী হবেন।

মুখ্যমন্ত্রীর বার্তার মূল লক্ষ্য তাই শুধু বিনিয়োগের অঙ্ক নয়, স্থানীয় কর্মসংস্থানকে শিল্পায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা। রঘুনাথপুরের মতো শিল্পাঞ্চলে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পুরুলিয়া-বাঁকুড়া-সহ জঙ্গলমহলে কাজের বাজার কতটা বদলায়, এখন নজর সেদিকেই। ঘোষিত বিনিয়োগগুলি বাস্তবে কত দ্রুত কর্মসংস্থানে পরিণত হয়, তার উপরই নির্ভর করবে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার এই আহ্বানের সাফল্য।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন