নীতিন নবীনের নতুন টিমে বাংলার দুই মুখ, বড় দায়িত্বে মনোজ টিগ্গা-মধুছন্দা; স্মৃতিও পেলেন গুরুত্বপূর্ণ পদ

নীতিন নবীনের নেতৃত্বে বিজেপির নতুন জাতীয় কমিটি ঘোষণা। বাংলার মনোজ টিগ্গা ও মধুছন্দা কর পেলেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হলেন স্মৃতি ইরানি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

বিজেপির সর্বভারতীয় সংগঠনে বড়সড় রদবদল। সোমবার নতুন জাতীয় কমিটি ঘোষণা করলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন (Nitin Nabin)। নতুন টিমে অভিজ্ঞতা ও নতুন মুখের সমন্বয় রাখার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ থেকেও দু’জন নেতা-নেত্রীকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উত্তরবঙ্গের সাংসদ মনোজ টিগ্গা (Manoj Tigga) হয়েছেন জাতীয় সম্পাদক এবং মধুছন্দা করকে জাতীয় সহ-সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি (Smriti Irani)-কে জাতীয় সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে।

২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপির সংগঠনকে আরও সক্রিয় করার লক্ষ্যেই এই নতুন টিম তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা। নতুন কমিটিতে মোট ১৩ জন জাতীয় সহ-সভাপতি, ৮ জন জাতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং ১৬ জন জাতীয় সম্পাদক রয়েছেন। দলীয় সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ এবং সামাজিক প্রতিনিধিত্বের দিকটিও তালিকা তৈরির সময় গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম মনোজ টিগ্গা। উত্তরবঙ্গের এই বিজেপি সাংসদকে জাতীয় সম্পাদক করা হয়েছে। এর ফলে দিল্লির কেন্দ্রীয় সংগঠনে বাংলার, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেল বলেই মনে করছে দলের একাংশ।

অন্যদিকে মধুছন্দা কর জাতীয় সহ-সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন। ১৩ জন জাতীয় সহ-সভাপতির তালিকায় মোট পাঁচজন মহিলা রয়েছেন। দলের নতুন কমিটিতে মহিলা নেতৃত্বের উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে এই তালিকায়। সামগ্রিক ভাবে নতুন জাতীয় টিমে ১০ জন মহিলা নেত্রী জায়গা পেয়েছেন বলে প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় চমকগুলির একটি অবশ্য স্মৃতি ইরানিকে ঘিরে। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে জাতীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আটজন জাতীয় সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে তিনিই একমাত্র মহিলা। দলের সাংগঠনিক কাজে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব—এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

জাতীয় সহ-সভাপতি পদেও একাধিক পরিচিত মুখকে রাখা হয়েছে। প্রাক্তন রাজস্থান মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া (Vasundhara Raje Scindia), রাম মাধব (Ram Madhav), বৈজয়ন্ত জয় পাণ্ডা (Baijayant Panda), ডি পুরন্দেশ্বরী, রেখা বর্মা এবং তারিক মনসুরদের মতো নেতারা এই তালিকায় রয়েছেন। ফলে নতুন কমিটিতে সম্পূর্ণ প্রজন্ম বদলের পথে না গিয়ে অভিজ্ঞ নেতাদেরও ধরে রাখা হয়েছে।

জাতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে পুরনো দায়িত্বেই থাকছেন বিনোদ তাওড়ে এবং সুনীল বনশল। বিপ্লব কুমার দেব, সতীশ পুনিয়া, গজেন্দ্র প্যাটেল, হরিশ দ্বিবেদী এবং সঞ্জয় ভাটিয়াও এই তালিকায় রয়েছেন। সংগঠন সাধারণ সম্পাদক পদে বি এল সন্তোষ এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শিবপ্রকাশ ও সৌদান সিংও থাকছেন।

কেন্দ্রীয় সংগঠনের পাশাপাশি অর্থ, দফতর, উত্তর-পূর্ব, মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়া—সব ক্ষেত্রেই নতুন করে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। পীযূষ গোয়েলকে জাতীয় কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে। তরুণ চুগের হাতে থাকছে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দায়িত্ব। উত্তর-পূর্বের সমন্বয়কের দায়িত্ব পেয়েছেন সম্বিত পাত্র।

মিডিয়া বিভাগেও বদল এসেছে। অনিল বলুনিকে জাতীয় মিডিয়া আহ্বায়ক করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে সহ-আহ্বায়ক হিসেবে থাকছেন আশিস উষা আগরওয়াল, প্রদীপ ভাণ্ডারী এবং সিদ্ধার্থ যাদব। সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন দীপক মাসকে। দলের বিভিন্ন মোর্চাতেও নতুন দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে।

নতুন কমিটিতে সামাজিক ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের বিষয়টিও বিশেষ ভাবে নজরে পড়ছে। মহিলা নেতৃত্বের পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বও রাখা হয়েছে। ছয়জন সংখ্যালঘু নেতা নতুন টিমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন বলে প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

নীতিন নবীনের নতুন টিমের দিকে তাকিয়ে বিজেপির সাংগঠনিক কৌশল সম্পর্কে একটি বিষয় স্পষ্ট—অভিজ্ঞদের রেখে নতুন মুখকে সামনে আনা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)-ও নতুন জাতীয় পদাধিকারীদের অভিনন্দন জানিয়ে দলীয় সংগঠনে অভিজ্ঞতা, তারুণ্য এবং তৃণমূলস্তরের যোগাযোগের সমন্বয়ের কথা বলেছেন।

বাংলার জন্য এই তালিকার তাৎপর্যও কম নয়। বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি এখন সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। সেই সময়েই কেন্দ্রীয় কমিটিতে মনোজ টিগ্গা ও মধুছন্দা করের জায়গা পাওয়া রাজ্য বিজেপির জন্য রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধিত্বকে জাতীয় স্তরে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি আলাদা করে নজর কাড়ছে।

সব মিলিয়ে নীতিন নবীনের নতুন জাতীয় টিম শুধু রুটিন সাংগঠনিক রদবদল নয়। ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচন এবং তার আগে একাধিক রাজ্যের রাজনৈতিক লড়াইয়ের কথা মাথায় রেখে অভিজ্ঞতা, নতুন প্রজন্ম, মহিলা নেতৃত্ব এবং আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব—এই চারটি সমীকরণ মিলিয়েই বিজেপি নতুন সংগঠন সাজিয়েছে। এখন দেখার, নতুন পদাধিকারীরা মাঠের রাজনীতিতে কতটা দ্রুত এই সাংগঠনিক রদবদলের প্রভাব দেখাতে পারেন।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন