বিধানসভায় বিধায়কদের সই জাল করার অভিযোগের মামলায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) বিরুদ্ধে এখনই কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে নারাজ কলকাতা হাই কোর্ট। সোমবার বিচারপতি কৌশিক চন্দের (Justice Kaushik Chanda) একক বেঞ্চে মামলার শুনানিতে সিআইডির তদন্ত নিয়ে একাধিক প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে কোনও বৈঠকে উপস্থিত থাকা বা অংশ নেওয়া থেকেই যে জাল সই করানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয় না, সেই প্রশ্নই আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। পাশাপাশি অভিষেকের অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচের মেয়াদও নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
মামলার শুনানিতে সিআইডির তরফে রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার দাবি করেন, বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া সংক্রান্ত একটি রেজোলিউশন বুকে ৭০ জন বিধায়ক সই করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন পরে অভিযোগ করেন, তাঁদের সই জাল করা হয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ৬ মে রেজোলিউশন বুকে কোনও সই ছিল না। পরে ১৯ মে সেখানে সই করা হয়। অভিযোগ ওঠার পর পাঁচ বিধায়কের স্বাক্ষর ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে (FSL) পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। সিআইডির বক্তব্য, সেই পরীক্ষায় ওই স্বাক্ষরগুলিকে জাল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই বক্তব্যের পরেই আদালত জানতে চায়, এই জালিয়াতির ঘটনায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দিষ্ট ভূমিকা কী। তদন্ত শেষ করতে আরও কত সময় প্রয়োজন, সেই প্রশ্নও করেন বিচারপতি কৌশিক চন্দ। আদালতের পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে ছিল—কোনও বৈঠকে অংশগ্রহণ করলেই কি ধরে নেওয়া যায় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জাল সই করানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন?
অভিষেকের পক্ষে আইনজীবী সব্যসাচী বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে যুক্তি দেন, তাঁর মক্কেল দলের সাধারণ সম্পাদক হলেও তিনি বিধায়ক নন। তাঁর বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট বৈঠকে অভিষেক উপস্থিত ছিলেন না। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে একটি নথি স্পিকারের কাছে পাঠানোর ভূমিকা থাকতে পারে, কিন্তু নথির সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব তাঁর ছিল না।
আইনজীবীর দাবি, নথিটি যাচাই করেছিলেন তৎকালীন তৃণমূল নেতা ফিরহাদ হাকিম। ফলে শুধু দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার কারণে অভিষেককে সই জালিয়াতির ঘটনায় দায়ী করা যায় কি না, সেই প্রশ্নই আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়।
এর পাল্টা সিআইডির তরফে বলা হয়, তদন্তে অভিষেকের ওই বৈঠকে অংশ নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য, একটি স্বাক্ষরও যদি জাল প্রমাণিত হয়, তা হলে এফআইআর দায়েরের ভিত্তি রয়েছে। এর পিছনে বৃহত্তর ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলেও আদালতে দাবি করা হয়।
তখনই বিচারপতি কৌশিক চন্দের প্রশ্ন, “মিটিংয়ে অংশ নিলেই কি বলা যায় জাল সই তাঁর নির্দেশে হয়েছে?” অর্থাৎ, কোনও বৈঠকে উপস্থিত থাকা এবং সরাসরি জালিয়াতির নির্দেশ দেওয়ার মধ্যে যে ফারাক রয়েছে, তদন্তে সেই যোগসূত্র কী ভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তা স্পষ্ট করতে হবে সিআইডিকে।
আদালত অবশ্য তদন্তে বাধা দেওয়ার কথা বলেনি। বরং স্পষ্ট করে দিয়েছে, সিআইডি তদন্ত চালাতে পারবে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, তদন্তকারীদের হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, প্রয়োজনীয় তদন্ত চালানো এবং তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থার উপর কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই।
এই মামলায় অভিষেকের রক্ষাকবচের মেয়াদ আগেও কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে। জুনে বিচারপতি কৌশিক চন্দের নির্দেশে তাঁকে তদন্তে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছিল এবং নির্দিষ্ট সময়ে সিআইডির সামনে হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে জুলাইতেও অন্তর্বর্তী সুরক্ষা আরও এক মাস বাড়ানো হয়।
এর আগে অভিষেক সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখিও হয়েছেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জুনে ভবানী ভবনে গিয়ে তদন্তকারীদের প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। সেই সময়ও আদালত তদন্তে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছিল।
সই জালিয়াতির এই মামলার সূত্রপাত বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে জমা পড়া নথি ঘিরে। তৃণমূলের তরফে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার প্রস্তাব সংক্রান্ত নথিতে একাধিক বিধায়কের সই নিয়ে আপত্তি ওঠে। পরে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ এবং সেই তদন্ত সিআইডির হাতে যায়।
মামলাটির তদন্তে শুধু অভিষেকই নন, তৃণমূলের আরও কয়েকজন নেতার কাছেও পৌঁছেছে সিআইডি। বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছিল। কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্রকেও নোটিস দেওয়া হয়। ফলে তদন্তের পরিধি যে অভিষেককে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ নেই, তা আগেই স্পষ্ট হয়েছিল।
তবে সোমবারের শুনানিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে অভিষেকের বিরুদ্ধে সরাসরি দায়ের অভিযোগের প্রমাণ নিয়ে আদালতের প্রশ্ন। এফএসএল রিপোর্টে কয়েকটি সই জাল প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা এক বিষয়; আর সেই জালিয়াতির সঙ্গে অভিষেকের প্রত্যক্ষ যোগ বা নির্দেশের প্রমাণ রয়েছে কি না, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন। আদালত আপাতত সেই দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর নিয়েই সন্তুষ্ট নয় বলেই শুনানির পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়েছে।
ফলে আপাতত অভিষেকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের আশঙ্কা কমল বলেই রাজনৈতিক মহলের একাংশের ব্যাখ্যা। তবে মামলা থেকে তিনি পুরোপুরি মুক্ত নন। সিআইডির তদন্ত চলবে এবং তদন্তে যদি নতুন কোনও প্রমাণ সামনে আসে, তা হলে পরবর্তী শুনানিতে তার প্রভাব পড়তে পারে। এখন নজর পরবর্তী শুনানিতে—জাল সইয়ের ঘটনায় আসল নির্দেশদাতা কে, এবং সেই অভিযোগের সঙ্গে অভিষেকের প্রত্যক্ষ যোগ প্রমাণ করার মতো কী তথ্য সিআইডির হাতে রয়েছে, শেষ পর্যন্ত তার উত্তরই মামলার গতিপথ ঠিক করবে।



