জাতীয় শিক্ষানীতি আসার আগেই বদল পরীক্ষায়! বাংলায় শুরু PARAKH, বদলাবে পড়ুয়াদের রিপোর্ট কার্ড

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর মূল্যায়ন সংস্কারের অংশ হিসেবে বাংলায় PARAKH প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি শুরু। রিপোর্ট কার্ডে বদলের পাশাপাশি পরীক্ষার প্রশ্নের ধরনেও ভবিষ্যতে পরিবর্তন আসতে পারে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ (NEP 2020) পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগেই পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষায় মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বদলের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। সোমবার থেকে বিদ্যাসাগর ভবনের অডিটোরিয়ামে পাঁচ দিনের কর্মশালার মাধ্যমে PARAKH নিয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়েছে। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মণ। নতুন ব্যবস্থায় শুধু পরীক্ষার নম্বর নয়, পড়ুয়ার সার্বিক শেখার অগ্রগতি, দক্ষতা এবং বিভিন্ন সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

PARAKH-এর পুরো নাম Performance Assessment, Review, and Analysis of Knowledge for Holistic Development। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-তে প্রস্তাবিত এই মূল্যায়ন কাঠামোর লক্ষ্য হল মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার বদলে competency-based বা দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের নথিতেও PARAKH-কে স্কুলশিক্ষায় মূল্যায়নের মান ও কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজ্য সরকারের তরফে আগেই জানানো হয়েছিল, ধাপে ধাপে জাতীয় শিক্ষানীতির বিভিন্ন দিক বাংলায় কার্যকর করার কাজ শুরু হবে। তারই অংশ হিসেবে এ বার মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে শিক্ষকদের প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হল। বিদ্যাসাগর ভবনে আয়োজিত পাঁচ দিনের কর্মশালায় PARAKH-এর বিভিন্ন দিক, মূল্যায়নের নতুন প্যারামিটার এবং তা স্কুলস্তরে কী ভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।

নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলির একটি দেখা যেতে পারে পড়ুয়াদের রিপোর্ট কার্ডে। এতদিন পরীক্ষার নম্বর এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ের ফলাফলই ছাত্রছাত্রীর পারফরম্যান্স বোঝার প্রধান মাপকাঠি ছিল। PARAKH-এর ভাবনায় তৈরি Holistic Progress Card-এ তার বদলে পড়ুয়ার বিভিন্ন দিকের অগ্রগতিকে একসঙ্গে তুলে ধরার কথা রয়েছে।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-তেও বলা হয়েছে, স্কুলের progress card-কে ৩৬০ ডিগ্রি বা multidimensional রিপোর্টে বদলানো হবে। সেখানে পড়ুয়ার cognitive, affective এবং psychomotor development-এর মতো বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নেওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে self-assessment, peer assessment এবং teacher assessment-ও গুরুত্ব পাবে।

অর্থাৎ, নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থায় কোনও পড়ুয়া শুধু পরীক্ষায় কত নম্বর পেলেন, সেটিই শেষ কথা হবে না। শেখা বিষয় বাস্তবে প্রয়োগ করার ক্ষমতা, বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে দক্ষতা প্রদর্শন, অংশগ্রহণ এবং সামগ্রিক অগ্রগতির মতো বিষয়গুলিও মূল্যায়নের পরিধিতে আসতে পারে।

PARAKH-এর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বড় আকারে স্কুলভিত্তিক মূল্যায়ন ও সমীক্ষা। পড়ুয়ারা বাস্তবে কতটা শিখছে, কোন ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে এবং কোন দক্ষতায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে—সেই তথ্য সংগ্রহ করে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার লক্ষ্যেই এই ধরনের assessment survey-এর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় স্তরেও PARAKH ইতিমধ্যে জাতীয় স্তরের competency survey পরিচালনা করেছে।

শুধু রিপোর্ট কার্ড নয়, ভবিষ্যতে পরীক্ষার প্রশ্নের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। জাতীয় শিক্ষানীতিতে বোর্ড পরীক্ষাকে মুখস্থনির্ভর না রেখে মূল competency এবং জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষমতা যাচাই করার কথা বলা হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে ঠিক কোন শ্রেণি বা কোন পরীক্ষা থেকে নতুন পদ্ধতি বাধ্যতামূলক হবে, তা এখনও নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি।

রাজ্যে PARAKH-এর কাজকে এগিয়ে নিতে বিদ্যাসাগর ভবনে একটি পৃথক PARAKH Cell খোলার কথাও জানানো হয়েছে। এই সেলের মাধ্যমে মূল্যায়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্যারামিটার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, assessment framework এবং পরবর্তী প্রয়োগের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্ত্রী জানিয়েছেন, হলিস্টিক ডেভেলপমেন্ট বা পড়ুয়ার সার্বিক বিকাশের কথা মাথায় রেখেই রিপোর্ট কার্ডে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ের জন্য আলাদা Holistic Progress Report Card চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে একজন পড়ুয়ার শিক্ষাগত অগ্রগতির পাশাপাশি তাঁর অন্যান্য সক্ষমতার ছবিও অভিভাবক ও শিক্ষকরা আরও স্পষ্ট ভাবে দেখতে পারবেন।

তবে এখনই কোনও নির্দিষ্ট পরীক্ষায় নতুন নিয়ম চালু হয়ে যাচ্ছে—এমনটা বলা হয়নি। কোন পরীক্ষা থেকে PARAKH-ভিত্তিক মূল্যায়ন কার্যকর হবে, তা পরবর্তী পর্যায়ে জানানো হবে বলে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে আপাতত সোমবারের কর্মশালাকে মূলত প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির প্রথম ধাপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

জাতীয় শিক্ষানীতির মূল্যায়ন সংস্কারের অন্যতম লক্ষ্যই হল পরীক্ষাকে শুধুমাত্র নম্বরের প্রতিযোগিতা না বানিয়ে শেখার প্রকৃত মান যাচাই করা। পশ্চিমবঙ্গে PARAKH-এর প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় আগামী দিনে স্কুলের পরীক্ষা, প্রশ্নপত্র এবং রিপোর্ট কার্ডে কতটা পরিবর্তন আসে, সেটাই এখন নজরে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন