আজ সকালেই প্রয়াত হয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ৮০ বছর বয়সে পাম অ্যাভিনিউয়ে নিজের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন বর্ষিয়ান সিপিআইএম নেতা। বুদ্ধবাবুর প্রয়াণে দলমত নির্বিশেষে সমাজের সমস্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শোক প্রকাশ করেছেন। তালিকার রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়, ভারতীয় দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় থেকে শুরু করে শিল্প জগতের তাবড় তাবড় ব্যক্তিত্ব। আর একেবারে দিনের শেষ লগ্নি বুদ্ধবাবু কে শ্রদ্ধা জানিয়েও সমাজমাধ্যমে বিস্ফোর ক বয়ান দিলেন বাংলাদেশের লেখিকা তসলিমা নাসরিন।
তসলিমা লিখেছেন, “বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মারা গেছেন। খবরটি একজন দিল সকালে। শেষদিকে তাঁর কষ্টের মাত্রা খুব বেশি ছিল। এও বললো। ২০০৩ সালের আগে এরকম খবর শুনলে আমি হয়তো চোখের জল ফেলতাম। কিন্তু তিনি আমার চোখের জল অনেক বছর ঝরিয়েছেন , তিনি বেঁচে থাকাকালীন। তাই চোখে আজ কোনও জল ঝরলো না তাঁর জন্য। আসলে কোনও জল আর অবশিষ্ট নেই । ২০০২ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে সখ্য ছিল। তারপর তাঁর কী হলো কে জানে, ২০০৩ সালে বলা নেই কওয়া নেই আমার দ্বিখণ্ডিত বইটি তিনি নিষিদ্ধ করলেন। সেদিনই মনে হয়েছিল আমি তাঁর চেয়ে খাঁটি বামপন্থী। আমি নাস্তিক, আমি নারীবাদী, আমি সমতা এবং সমানাধিকারে বিশ্বাস করি।”


সঙ্গে তিনি আরও লিখেছেন, “একটি মৌলবাদি দেশে কিশোর বয়স থেকে লড়াই করছি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। লড়াই করছি সমতার জন্য। দ্বিখণ্ডিত বইটিতে আমি রাষ্ট্রের কোনও রকম ধর্ম থাকার বিরুদ্ধে লিখেছিলাম । রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করার জন্য লিখেছিলাম বলে তিনি আমার বই নিষিদ্ধ করেছিলেন। ভাবা যায় একজন বড় বামপন্থী নেতা রাষ্ট্রধম ইসলাম থাকা সমর্থন করতে চান। যুক্তি দেন, তা না হলে মুসলমানরা রাগ করবে। হাইকোর্টে মানবাধিকার সংস্থা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে মামলা করলো। জয়ী হলো। দ্বিখণ্ডিত থেকে বুদ্ধবাবুর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল”।
এর পর তসলিমা আরও বলেন, “তিনি আমার ওপর আগুন হয়ে রইলেন রেগে। আরে মামলা তো আমি করিনি, জয়ী তো আমি হইনি, সুজাত বাবুরা হয়েছে। এরপর থেকেই আমাকে দেশ থেকে, সম্ভব না হলে কলকাতা থেকে তাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। ২০০৭ সালে আমাকে সাড়ে চারমাস গৃহবন্দি রেখেছিলেন, যেন অতিষ্ট হয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাই। কিন্তু কোথাও যাইনি আমি। শেষ পর্যন্ত একটা কুৎসিত নাটক করে তাড়িয়েছিলেন। তারপর কী হলো? আপদ তো বিদায় হলো। তিনি নিশ্চয়ই খুব আনন্দে ছিলেন তখন। আর অসহায় নিরীহ নির্বাসিত, নির্যাতিত সৎ ও আপসহীন মানুষটির জীবন কতটুকু দুর্বিষহ হয়েছিল, সে কথা আজ আর নাই বললাম।”
লেখিকার আরও দাবি, “শুনেছি পরে একটি বই লিখেছেন তিনি। তাঁর কী কী ভুল হয়েছিল তাঁর শাসনামলে, কী কী ভুল করেছিলেন, সবই লিখেছেন। শুধু আমাকে পশ্চিমবংগ থেকে বিনা দোষে যে তাড়িয়েছিলেন, সেই কথাটা উল্লেখ করেননি। এর মানে এ নিয়ে তাঁর কোনও অনুশোচনা ছিল না, তিনি মনে করতেন তিনি যা করেছিলেন ভাল করেছিলেন। আমার স্বপ্ন সাধ সব চুরমার করে দিয়ে তিনি ভাল করেছিলেন।”


একেবারে শেষে তসলিমার সংযোজন, “আমি ইউরোপ থেকে বাংলা ভাষার টানে কলকাতায় বাস করতে গিয়েছিলাম, যেহেতু বাংলাদেশের কোনও সরকারই আমাকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়নি। কিন্তু আমি কল্পনাও করতে পারিনি নন্দনে যে বুদ্ধবাবুর সঙ্গে সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে আড্ডা দিতাম, প্যারিস থেকে তাঁর জন্য তিনি যা চাইতেন উপহার এনে দিলাম, সেই মানুষটি একসময় আমার বাংলা মা’কে, বাংলার আমার শেষ আশ্রয়টিকে চিরকালের মতো টেনে নিয়ে যাবেন আমার পায়ের তলা থেকে”।
এখনে না থেমে লিখিকা আরও বলেন,”মমতা দিদি আমার ব্যাপারে বুদ্ধবাবুরই পদাংক অনুসরণ করে চলেন, সুতরাং তিনিও আমাকে একই অচ্ছুৎ হিসেবে ট্রিট করবেন, এতে অবাক হইনা। আজ বুদ্ধবাবুর প্রয়াণে পুরোনো কথা স্মরণ এলো। আমি আত্মায় বিশ্বাস করি না, পরলোকে বিশ্বাস করি না। তাই আজ অন্য সবার মতো বলতে পারলাম না যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন ইত্যাদি। শুধু বলবো, কমরেড, লাল সালাম।”







