অর্ক সানা (সম্পাদক, নজরবন্দি.ইন): পাম অ্যামিনিউয়ের সরকারি আবাসনে দু-কামরার ফ্ল্যাটে কেটেছে গোটা জীবন। বারবার বাড়ি বদলের কথা উঠলেও তা এড়িয়ে গিয়েছেন সচেতন ভাবেই। তাঁর সারা জীবনের ব্রত ‘সিম্পল লিভিং হাই থিঙ্কিং’ নিয়েই কাটিয়ে ফেললেন জীবনের ৮০ টা বছর। ছাত্র রাজনীতি দিয়ে রাজনীতির ইনিংস শুরু আর পাঁচ জন কমিউনিস্ট নেতার মতই, তবুও তিনি আলাদা। বরাবরের আলাদা। সাংবাদিকতা জীবনে প্রবেশ করার পর মাত্র ৩ বার বুদ্ধবাবুকে সামনে দেখেছি, কথা হয়েছে ২ বার। আমার কেরিয়ার শুরু ২০০৯ সালে আর ২০১১-তে মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
সময়টা ২০০৬ সাল, কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পন ঘটেছে আমার, আর বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে রাজ্যের ক্ষমতায় সিপিআইএম। সেইবারই শেষবার, ‘ব্র্যান্ড বুদ্ধ’ জয়ী হয়েছিল, জেতেনি সিপিআইএমের সংগঠন। রাজ্যের দক্ষিনপন্থী দলগুলো বরাবরই জ্যোতি বসুকে শিল্প বিরোধী তকমা দিয়ে এসেছে। কিন্তু সেই তকমা মুহুর্তে সরে যায় যখন বুদ্ধ বাবু হয়ে ওঠেন ব্র্যান্ড ‘বুদ্ধ’, ‘আমার সরকার – আপনার সরকার’ স্লোগান বদলে যায় ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’ -এ। ২০০৬ সালে লাল আবির মেখেছিলাম, সারা বাংলার মত আমিও।


সে যাই হোক, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চতায় উঠেছে তাঁর রাজনৈতিক জীবন। ২ বার বসেছেন বাংলার মসনদেও। কিন্তু, বামপন্থার শিকড় ছেড়ে বের হননি জীবনের শেষ লগ্ন পর্যন্ত। যাঁকে নিয়ে কখনও কোনও ‘কু-কথা’ শোনা যায়নি খোদ রাজ্যের ‘পালাবদলের’ কাণ্ডারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলাতেও। আজ যার প্রয়াণে ‘সততার-প্রতীক’অর্থাৎ রাজনীতিতে কোটি টাকার সার্টিফিকেট, দরাজ হাতে দিল তৃণমূল-বিজেপি-কংগ্রেস একযোগে… তিনিই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
আজন্ম মনে হত লাল – লাল – আর – লাল, শুধুই লাল ঝান্ডা। ২০০৬ সালের নির্বাচনে যখন বুদ্ধবাবু রেকর্ড আসন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হলেন, তখন মনে হত আরও ২৫ বছর। জন্মেছি লাল ঝান্ডার আমলে মৃত্যুও হবে লাল ঝান্ডার আমলেই। অসাধারণ লাগত মানুষটাকে। এখনও ওনার বইগুলো পড়লে মনে হয় এমন উচ্চ-মানের সাহিত্যিক… রাজনীতিতে যদি না আসতেন অনেক লেখা পেতে পারতাম। এদিকে সময় গড়াল, তারপর ধিরে ধিরে কেমন সব বদলে গেল। ছোটবেলায় যে নেতাদের দেখতাম একরকম, বড়বেলায় তাঁদের কেমন অন্যরকম দেখাল। বদলে যেতে লাগল সময়।
২০০৯ সাল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী। আমার সাংবাদিকতার প্রথম বছর যখন শেষের পথে প্রথম সুযোগ পেলাম দেখা করার। বলেছিলেন, ২০১১ সালে তৃণমূলের জয় কেউ আটকাতে পারবে না। বিশ্বাস করিনি… পালটা প্রশ্ন করেছিলাম, বুদ্ধবাবু হেরে যাবেন বলছেন? আজকের বর্তমান সেদিনের বর্তমান কে নিয়ে বলেছিলেন, ‘বুদ্ধবাবুর মত মানুষরা হারেন না, হারবে সিপিএম’… বিশ্বাস করিনি… বাকিটা ইতিহাস। আর আজ ইতিহাসে পাতায় সেই বুদ্ধদেব… বলতে ইচ্ছে করছে, ‘স্বর্গের নিচে মহা বিশৃঙ্খলা’ চলছে বুদ্ধবাবু, এখনই চলে গেলেন? গেলেন ঠিকই কিন্তু রেখে গেলেন, ‘বিপন্ন জাহাজের এক নাবিকের গল্প’।









