নজরবন্দি ব্যুরো: রাখী পূর্ণিমার দিন যাদবপুরে ‘বন্দেমাতরম’ ও রাখিবন্ধন নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে মন্তব্য করলেন রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। তাঁর দাবি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখীকে ভাই-বোনের সম্পর্কের বাইরে এনে সামাজিক বন্ধনের প্রতীক করেছিলেন এবং ‘বন্দেমাতরম’-এর সঙ্গে তা যুক্ত করে বঙ্গভঙ্গ রোধে ভূমিকা নিয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রীর বক্তব্যের একটি অংশ নিয়েই ইতিমধ্যে ইতিহাসের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
রাখী পূর্ণিমায় যাদবপুরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দিলীপ ঘোষ বলেন, “ভারতবর্ষে রাখী আমাদের একতা ঐতিহ্য। সামাজিক বন্ধনের একটা সূত্র।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে রাখীকে ভাই-বোনের সম্পর্কের বাইরে এনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৃহত্তর সামাজিক ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
এরপরই ‘বন্দেমাতরম’ প্রসঙ্গে মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দিলীপের কথায়, রবীন্দ্রনাথ ‘বন্দেমাতরম গান লিখে’ সামাজিক উৎসবের মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গ রোধ করেছিলেন। অথচ ইতিহাসের তথ্য বলছে, ‘বন্দেমাতরম’-এর রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গানটি লেখেননি; বরং ১৮৯৬ সালের কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে তিনি গানটি পরিবেশন করেছিলেন।
তবে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের রাখিবন্ধন কর্মসূচির যোগ অবশ্যই ঐতিহাসিক। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন বাঙালির সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে রাখিবন্ধনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই সময় রাখী ধর্ম-বর্ণের বিভাজন অতিক্রম করে বাঙালির ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
সেই ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনেই যাদবপুরকে ঘিরে বর্তমান রাজনীতির কথাও তোলেন দিলীপ। তাঁর অভিযোগ, যাদবপুরে “কিছু লোক বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতা নিয়ে কাজ করছে” এবং সেখানে বিচ্ছিন্নতা ছড়ানো হচ্ছে। তাই তাঁর মতে, ওই এলাকায় রাষ্ট্রবাদের প্রয়োজন আরও বেশি।
দিলীপের বক্তব্য, “সমাজকে এক করার জন্যে রাখী হচ্ছে সবচেয়ে বড় মাধ্যম।” তাঁর আহ্বান, যাদবপুরে জোরদার রাখিবন্ধনের পাশাপাশি জোরদার ‘বন্দেমাতরম’ হোক। এদিন যাদবপুরে ১০ হাজার কণ্ঠে ‘বন্দেমাতরম’ গাওয়ার কর্মসূচির কথাও উঠে আসে।
অর্থাৎ, রাখিবন্ধনের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সামনে রেখে যাদবপুরে জাতীয়তাবাদ ও সামাজিক ঐক্যের বার্তা দিতে চাইছে রাজনৈতিক শিবির। কিন্তু সেই বার্তার মধ্যেই ‘বন্দেমাতরম’-এর রচয়িতা নিয়ে দিলীপ ঘোষের মন্তব্য নতুন করে ইতিহাসচর্চার প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই ‘বন্দেমাতরম’-এর স্রষ্টা হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের ভূমিকা ইতিহাসে স্পষ্ট—দুই তথ্যকে এক করে দেখলে বিভ্রান্তির জায়গা তৈরি হয়।



