তোলাবাজি, ফ্ল্যাট দখল, হুমকি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ঘিরে বিতর্কে কালিকাপুরের প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর। সম্পত্তি বৃদ্ধির হিসাব নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। ক্ষমতার পালাবদলের পর সামনে আসছে একের পর এক অভিযোগ। কলকাতা পুরসভার ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে। তোলাবাজি, ফ্ল্যাট দখল, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং সম্পত্তি বৃদ্ধির উৎস নিয়ে এলাকায় শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।
কালিকাপুর ও মুকুন্দপুর এলাকার বহু বাসিন্দার অভিযোগ, তৃণমূল আমলে প্রভাব-প্রতিপত্তিকে হাতিয়ার করে এলাকায় একপ্রকার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাড়ি নির্মাণ থেকে ব্যবসায়িক কাজ— বিভিন্ন ক্ষেত্রেই অর্থ দাবি করা হতো বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় কয়েকজন বিজেপি সমর্থকের দাবি, এলাকায় কোনও কাজ করতে গেলে টাকা দেওয়া কার্যত বাধ্যতামূলক ছিল। কারও কাছ থেকে কয়েক হাজার, আবার কারও কাছ থেকে লক্ষাধিক টাকা নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। যদিও এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে তাঁর সম্পত্তি বৃদ্ধিকে ঘিরে। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, ২০১৫ সালে অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মোট সম্পত্তির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫১.৫ লক্ষ টাকা। সেই সময় তাঁর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছিল প্রায় ২ লক্ষ টাকার কিছু বেশি।
কিন্তু ২০২১ সালের নির্বাচনী হলফনামায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি দেখা যায়। সেখানে তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩.৭ কোটি টাকা। একইসঙ্গে বার্ষিক আয়ও বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৯ লক্ষ টাকায় পৌঁছায়। মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে সম্পত্তির এই বিপুল বৃদ্ধিই এখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সন্তোষপুরে তাঁর বিলাসবহুল আবাসন নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, একজন কাউন্সিলরের সরকারি ভাতা দিয়ে এমন বিপুল সম্পত্তি গড়ে তোলা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অনেকেই অভিযোগ করছেন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতাই এই উত্থানের মূল কারণ।
এলাকার একাধিক বাসিন্দা আরও দাবি করেছেন, বহু বছর ধরে কিছু ফ্ল্যাট জোর করে আটকে রাখা হয়েছিল। এমনও অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হওয়ায় কয়েকজনকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে এখনও প্রমাণিত হয়নি।
সোমবার প্রাক্তন কাউন্সিলরের দলীয় কার্যালয় থেকে উদ্ধার হওয়া কিছু নথি ও সামগ্রী নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ওই অফিস থেকেই এলাকার বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করা হতো। উদ্ধার হওয়া নথিপত্রের ভিত্তিতে তদন্তের দাবি তুলেছেন অনেকেই।
অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলির সত্যতা শেষ পর্যন্ত তদন্তেই স্পষ্ট হবে। তবে রাজনৈতিক পালাবদলের পর কালিকাপুরে যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে, তা এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সম্পত্তি বৃদ্ধি থেকে ক্ষমতার ব্যবহার— একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে এলাকার মানুষ।



