দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার পর হঠাৎই বিরোধী আসনে—এই নতুন বাস্তবতায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবেন, তা নিয়েই এখন জোর জল্পনা। তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্য থেকে ক্ষমতাচ্যুত হতেই বদলে গিয়েছে রাজনৈতিক সমীকরণ, আর তার সঙ্গেই সামনে এসেছে দলের অন্যতম প্রধান মুখের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন।
২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অভিষেকের রাজনৈতিক উত্থান। ২০১৪ সালে সাংসদ হওয়ার পর ধাপে ধাপে দলের অন্দরে তাঁর প্রভাব বেড়েছে। সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, প্রার্থী নির্বাচন থেকে কৌশল নির্ধারণ—প্রায় সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন তিনি। কিন্তু এতদিনের সেই ক্ষমতার পরিসর ভেঙে এখন তাঁকে কাজ করতে হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায়।


মঙ্গলবার বিকেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে অভিষেক হাজির হবেন বলে জানা গিয়েছে। সেখানে দলের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে ইঙ্গিত মিলতে পারে। তবে তার আগেই দলীয় অন্দরে শুরু হয়ে গেছে নানা আলোচনা—বিরোধী পরিসরে তৃণমূলের লড়াই কীভাবে গড়ে উঠবে এবং সেখানে অভিষেকের ভূমিকা কী হবে।

তৃণমূলে অভিষেকের উত্থান সবসময়ই আলোচনার বিষয়। কখনও তাঁকে ‘যুবরাজ’, কখনও ‘সেনাপতি’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনের ভেতরে নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনা, পুরনো কাঠামোয় পরিবর্তন আনা—এই সব পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি ‘নতুন তৃণমূল’-এর ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল সেই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
গত কয়েক বছরে দলের ভিতরে তাঁর ক্ষমতা যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে মতপার্থক্যও। সংগঠন পরিচালনা, প্রার্থী বাছাই—এই সব ইস্যুতে কখনও কখনও মমতার সঙ্গে তাঁর ভিন্নমতও সামনে এসেছে। যদিও সঙ্কটের সময়ে সেই মতভেদ মিটেছে বলেই দাবি দলের।


রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এতদিন অভিষেক যে রাজনীতি করেছেন, তা মূলত ক্ষমতার ভিতরে থেকেই। প্রশাসনিক সমর্থন, সংগঠনের শক্তি—সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী অবস্থান থেকে লড়াই করেছেন তিনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বিরোধী রাজনীতির বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা এবং চ্যালেঞ্জ—এই সবের মুখোমুখি হতে হবে তাঁকে।
অভিষেকের ঘনিষ্ঠদের অবশ্য দাবি, জাতীয় রাজনীতিতে তিনি বরাবরই বিজেপি-বিরোধী পরিসরে সক্রিয়। দিল্লির রাজনীতিতে বিরোধী অবস্থান থেকেই তাঁর লড়াই, ফলে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। পাশাপাশি, তদন্ত সংস্থা সংক্রান্ত চাপের মুখেও তিনি সক্রিয় থেকেছেন—এই অভিজ্ঞতাও কাজে লাগতে পারে।
তবে দলের একাংশের মত, এতদিনের রাজনৈতিক পথচলায় ক্ষমতার ছায়া সবসময়ই ছিল। সেই কাঠামো ভেঙে গেলে নতুন করে সংগঠন গড়া কতটা সম্ভব, তা নিয়েই প্রশ্ন। বিশেষ করে প্রার্থী নির্বাচন ও সাংগঠনিক সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা ফলপ্রসূ হয়নি বলেই মনে করছেন অনেকে।
সব মিলিয়ে, তৃণমূলের পরাজয়ের পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করা। বিরোধী রাজনীতির কঠিন ময়দানে তিনি কতটা সফল হবেন, সেটাই এখন দেখার।







