অর্ক সানা, সম্পাদক(নজরবন্দি.ইন): ২০২৬-এর রায় স্পষ্ট—ভাতা নয়, মানুষ চাইছে কাজ, নিরাপত্তা আর সম্মান। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক প্রকল্পের উপর ভর করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সমীকরণকে এক ধাক্কায় বদলে দিল বাংলার ভোটাররা। যে রাজনীতিতে মাসিক অনুদান ছিল প্রধান হাতিয়ার, সেই রাজনীতির সীমাবদ্ধতাকেই এবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল জনমত।
গত দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গে শাসক রাজনীতির একটি বড় স্তম্ভ ছিল বিভিন্ন ভাতা-ভিত্তিক প্রকল্প—লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, যুবশ্রী। বিশেষত নারী ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে এই প্রকল্পগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ২০২১ সালে এই মডেল কার্যত তৃণমূলের জয়ের প্রধান কারণগুলির মধ্যে ছিল। কিন্তু ২০২৬-এ দেখা গেল, একই কৌশল আর আগের মতো কার্যকর থাকল না।


এবারের নির্বাচনে ভাতার প্রতিশ্রুতি দুই পক্ষই দিয়েছিল। একদিকে শাসক দল প্রকল্পের পরিধি বাড়ানোর কথা বলেছে, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরও আর্থিক সহায়তার অঙ্ক বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অর্থাৎ লড়াইটা কেবল ভাতার অঙ্কে সীমাবদ্ধ ছিল না—বরং তা রূপ নিয়েছিল বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির লড়াইয়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের মনোভাব বদলের মূল কারণ কর্মসংস্থানের সংকট। রাজ্যের বহু শিক্ষিত তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায়। বিভিন্ন আন্দোলন, প্রতিবাদ এবং নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ জনমানসে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ফলে ভাতার নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে স্থায়ী কর্মসংস্থানের দাবিই বড় হয়ে উঠেছে।
নারী ভোটব্যাঙ্কের ক্ষেত্রেও একই পরিবর্তন লক্ষণীয়। এতদিন যাঁরা প্রকল্পের সুবিধাভোগী ছিলেন, তাঁদের মধ্যেই একাংশ এবার নিরাপত্তার প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বিগত কয়েক বছরের একাধিক ঘটনা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ সাধারণ মহিলাদের মনে প্রভাব ফেলেছে। ভোটের ফল সেই মানসিকতার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।


এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শাসনের বিরুদ্ধে জমে থাকা অসন্তোষ। কাটমানি, স্থানীয় স্তরে প্রভাব খাটানো, তোলাবাজি—এই অভিযোগগুলি বহুদিন ধরেই জনজীবনে আলোচিত। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে যে প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়, তারও প্রভাব এই নির্বাচনে স্পষ্ট।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-এর ফলাফল কেবল সরকার বদলের গল্প নয়—এটি রাজনৈতিক দর্শনের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত। অর্থনৈতিক সহায়তা প্রয়োজন, কিন্তু তা যদি কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং সুশাসনের বিকল্প হয়ে ওঠে, তাহলে তার গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়—এই বার্তাই যেন দিয়েছে বাংলার ভোটাররা।
সব মিলিয়ে, বাংলার মানুষ এবার একটাই কথা বুঝিয়ে দিল—হাত পেতে অনুদান নয়, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগই আসল। আর সেই সুযোগ দিতে না পারলে, যত বড় প্রকল্পই থাকুক, ভোটের অঙ্কে তার প্রভাব কমবেই।







