অর্ক সানা, সম্পাদক (নজরবন্দি): বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মুহূর্ত—ভারতীয় জনতা পার্টির জয়, নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর-র শপথ, আর সেই উদযাপনের আবহে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে বহু পুরনো স্বপ্ন। কিন্তু এই জয়ের উল্লাসে কোথাও যেন চাপা পড়ে যাচ্ছে এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বের নাম—হরিপদ ভারতী। হরিপদ ভারতী-কে স্মরণ না করলে বাংলায় বিজেপির এই উত্থানের ইতিহাস কি সম্পূর্ণ বলা যায়?
বাংলার মাটি বহু সংগ্রামের সাক্ষী। বহু স্বপ্ন, বহু ব্যর্থতা আর অবশেষে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রাজনৈতিক পালাবদলের ইতিহাস লিখল এই রাজ্য। ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে যখন ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতার দোরগোড়ায়, তখন দলের অন্দরে উৎসবের আবহ স্বাভাবিক। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ভিভিআইপিদের উপস্থিতি, দেশজুড়ে উল্লাস—সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত।


এই মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই স্মরণ করা হচ্ছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-এর নাম। কারণ বাংলায় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বীজ তিনিই বপন করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস কখনও এক ব্যক্তির নয়। ইতিহাস গড়ে ওঠে অনেক অজানা, অপ্রচারিত মানুষের অবদানে। সেই তালিকায় একেবারে প্রথম সারিতেই থাকা উচিত হরিপদ ভারতীর নাম।
বাংলার পালাবদলের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা এক মহীরুহ—হরিপদ ভারতীকে ভুললে ক্ষমা করবে না ইতিহাস

“মাস্টারমশাই”—এই নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন তিনি। একজন শিক্ষক, একজন চিন্তাবিদ, এবং সর্বোপরি একজন আদর্শবাদী রাজনীতিক। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে হিন্দু মহাসভায় যোগ দেন। এরপর ভারতীয় জনসঙ্ঘের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পথচলা, যা পরবর্তীকালে বিজেপির ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হরিপদ ভারতী শুধু রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক বিরল সংসদীয় ব্যক্তিত্ব। ১৯৭৭ সালে জোড়াবাগান বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি আমৃত্যু মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর বক্তৃতা ছিল যুক্তিনিষ্ঠ, মার্জিত এবং গভীর দর্শনে সমৃদ্ধ। এমনকি বিরোধী দলও তাঁর বক্তব্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল। বলা হয়, প্রবাদ প্রতিম কমিউনিস্ট রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব জ্যোতি বসু নিজে তাঁর বক্তৃতার জন্য অতিরিক্ত সময় বরাদ্দ করতেন—এ এক বিরল সম্মান।


একজন অধ্যাপক হিসেবে তাঁর জীবনও সমান উজ্জ্বল। যশোর থেকে কলকাতা—শিক্ষা ও চিন্তার জগতে তাঁর অবদান ছিল গভীর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-তে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে তিনি যে মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনেও প্রতিফলিত হয়।
জরুরি অবস্থার সময় তাঁর কারাবাস তাঁর জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ‘মিসা’ আইনে বন্দি হয়ে প্রেসিডেন্সি জেলে কাটানো দিনগুলোর অভিজ্ঞতা তিনি লিখে গেছেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে। সেই লেখায় যেমন ছিল সংগ্রামের কাহিনি, তেমনই ছিল এক সংবেদনশীল মনের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ।
আজ যখন বিজেপি বাংলার ক্ষমতায়, তখন এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—এই পথচলার ভিত্তি কোথায়? সেই ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন হরিপদ ভারতীর মতো মানুষরা। তাঁদের সংগ্রাম, তাঁদের ত্যাগ, তাঁদের বিশ্বাস—এসবের উপর দাঁড়িয়েই আজকের এই সাফল্য।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বর্তমান প্রজন্মের অনেক বিজেপি কর্মীই তাঁর নাম জানেন না। ইতিহাসের এই বিস্মৃতি শুধু অন্যায় নয়, তা একপ্রকার অবমাননা। কারণ, কোনও রাজনৈতিক সাফল্যই হঠাৎ করে আসে না। তার পেছনে থাকে বছরের পর বছর পরিশ্রম, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগ।
আজ যখন শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন, তখন এই মুহূর্তটি শুধু উদযাপনের নয়—এটি আত্মসমালোচনারও। আমরা কি আমাদের ইতিহাসকে যথাযথ সম্মান দিচ্ছি? আমরা কি সেই মানুষদের স্মরণ করছি, যাঁদের স্বপ্ন আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে?
হরিপদ ভারতী শুধু একটি নাম নয়, তিনি একটি অধ্যায়। বাংলায় বিজেপির উত্থানের ইতিহাসে তিনি এক নীরব স্থপতি। তাঁর অবদানকে স্মরণ করা মানে শুধু অতীতকে সম্মান জানানো নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত ভিত তৈরি করা।
বাংলা আজ নতুন ইতিহাস লিখছে। কিন্তু সেই ইতিহাস যেন অসম্পূর্ণ না থাকে—সেই দায়িত্ব আমাদের সকলের।







