অর্ক সানা, সম্পাদক(নজরবন্দি): ‘বন্দে মাতরম’—এই দুই শব্দে যেমন জেগে উঠেছিল এক যুগের আত্মমর্যাদা, তেমনই সময়ের স্রোতে কখনও কখনও তা বহন করেছে উত্তাপ, বিভাজন এবং অন্ধ আবেগের ছায়া। তাই এই গানের ইতিহাস বিচার করতে গেলে কেবল তার দীপ্তিকে স্বীকার করলেই চলে না, তার সম্ভাব্য দাহকেও অস্বীকার করা যায় না। সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা আমাদের সেই দ্বৈততাকেই মেনে নিতে বাধ্য করে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন ‘আনন্দমঠ’-এর পৃষ্ঠায় ‘বন্দে মাতরম’ রচনা করেন, তখন তিনি কেবল একটি গান লেখেননি—একটি ভাবমন্ত্র নির্মাণ করেছিলেন। মাতৃভূমিকে দেবীমূর্তিতে কল্পনা করে তিনি এমন এক আবেগ জাগিয়ে তুলেছিলেন, যা পরাধীন ভারতবাসীর আত্মপরিচয়ের ভিত গড়ে দেয়। “সুজলাং সুফলাং”—এই কাব্যিক উচ্চারণ কেবল প্রকৃতির বন্দনা নয়, এক গভীর আত্মসমর্পণের আহ্বান।



কিন্তু বঙ্কিমের রচনায় এই মাতৃমূর্তির পাশাপাশি যে “রিপুদলবারিণী” ধারণা উপস্থিত, সেখানেই প্রশ্নের সূত্রপাত। মাতৃভূমির বন্দনা যখন শত্রু-চিহ্নিত করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন দেশপ্রেমের সঙ্গে এক সূক্ষ্ম বিভাজনরেখা তৈরি হয়। সেই রেখা ইতিহাসের নানা সময়ে স্পষ্টতর হয়েছে, কখনও রাজনৈতিক প্রয়োজনে, কখনও জনআবেগের তাড়নায়।
এই জটিলতাকেই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি প্রথম ‘বন্দে মাতরম’-এ সুর দিয়েছিলেন, কংগ্রেসের অধিবেশনে নিজ কণ্ঠে গেয়েছিলেন—অর্থাৎ গানের দীপ্তিকে তিনি অস্বীকার করেননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি দেখলেন, এই গান কেবল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকছে না; অনেক ক্ষেত্রে তা উগ্র জাতীয়তাবাদের হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
“বন্দে মাতরম”, বঙ্কিম ও রবি: এ গানের দীপ্তিকে স্বীকার করে দাহকে অস্বীকার করলে সত্যের অপলাপ করা হবে

‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসে নিখিলেশের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ যে প্রশ্ন তুলেছিলেন—“দেশকে দেবতা বলিয়ে অন্যায়কে পুণ্য বলা”—সেই প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ, যখন দেশপ্রেম যুক্তিবোধকে অতিক্রম করে, তখন তা সহজেই ‘মন-ভোলানো মন্ত্রে’ পরিণত হয়। আর সেই মন্ত্রের আড়ালে অন্যায়ও ন্যায় বলে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।


রবীন্দ্রনাথের আপত্তি কখনও বঙ্কিমের প্রতি ছিল না; ছিল সেই সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে, যা মানুষের পরিচয়কে ধর্ম, জাতি বা গোষ্ঠীর খাঁচায় বন্দি করে। তাঁর দৃষ্টিতে দেশপ্রেম মানে কেবল নিজের ভূখণ্ডের প্রতি ভালোবাসা নয়, বরং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা—যেখানে হিন্দু-মুসলমান, দেশি-বিদেশি সকলেই এক বৃহত্তর মানবিকতার অংশ।
এই কারণেই তিনি ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুই স্তবককে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নিলেও, পুরো গানের ব্যবহার নিয়ে সতর্ক ছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, উনিশ শতকের সাহিত্যিক কল্পনা বিশ শতকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।

ইতিহাস সাক্ষী, ‘বন্দে মাতরম’ স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা হয়েছে, আবার কখনও তা বিভাজনের স্লোগানেও রূপান্তরিত হয়েছে। এই দ্বৈততা অস্বীকার করা মানে ইতিহাসকে সরলীকরণ করা। বঙ্কিমচন্দ্রের স্বপ্ন ছিল জাতিকে জাগানো; রবীন্দ্রনাথের প্রয়াস ছিল সেই জাগরণকে মানবিকতার আলোয় স্থিত করা।
আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এই গানকে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আছে—না অন্ধ ভক্তিতে, না অকারণ প্রত্যাখ্যানে। বরং প্রয়োজন পরিশীলিত বোধে, যেখানে আমরা স্বীকার করি—এই গান আমাদের গর্ব, আবার আমাদের দায়ও।
কারণ, যে গান মানুষকে জাগাতে পারে, সেই গানই মানুষকে উত্তেজিতও করতে পারে। সেই শক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেটাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে তার অর্থ।
তাই একথা বলা যায়—
বন্দে মাতরম’-এর দীপ্তিকে স্বীকার করতে হলে তার দাহকেও বুঝতে হবে। একটিকে মান্য করে অন্যটিকে অস্বীকার করা মানে সত্যকেই অস্বীকার করা।







