পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার পালাবদলের পর রাজনৈতিক লড়াই এখন ঘুরে গিয়েছে রাজধানী কলকাতাকে ঘিরে। নবান্ন থেকে মহাকরণে প্রশাসনিক প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতির মাঝেই বড় প্রশ্ন— তৃণমূলের দীর্ঘদিনের দুর্গ কলকাতা পুরসভাও কি হাতছাড়া হতে চলেছে? বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বলছে, কলকাতা শহরের অধিকাংশ ওয়ার্ডেই এগিয়ে বিজেপি। আর সেই পরিসংখ্যানই এখন তৃণমূলের অন্দরে বাড়াচ্ছে অস্বস্তি।
রাজ্যে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে, এবার নজর ছোট লালবাড়ির দিকে। কলকাতা পুরসভার ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১০১টিতে বিধানসভা নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। তৃণমূল এগিয়ে মাত্র ৪৩টিতে। ফলে আগামী পুরভোটকে ঘিরে কার্যত আগাম স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে দুই শিবিরে।


ডিসেম্বর নাগাদ কলকাতা পুরসভার নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও, রাজনৈতিক মহলের একাংশের অনুমান— নতুন সরকার চাইলে নির্ধারিত সময়ের আগেই ভোট হতে পারে। যদিও বিজেপির তরফে এখনও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কিছু জানানো হয়নি। তবে তৃণমূলের অন্দরে এখন থেকেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, শহুরে ভোটব্যাঙ্কে বড় ধাক্কার প্রভাব পুরভোটেও পড়তে পারে।
কলকাতা পুরসভা দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি। বাম আমলেই প্রথম কলকাতা পুরসভা দখল করেছিল তৃণমূল। তারপর ২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকে কার্যত নিরঙ্কুশ আধিপত্য ছিল শহরের প্রশাসনে। কিন্তু এবারের বিধানসভা ভোটে সেই চেনা সমীকরণে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।
তৃণমূলের একাংশের মতে, মানুষের ক্ষোভ শুধু রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে নয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও জমেছিল দীর্ঘদিন ধরে। দুর্নীতি, সিন্ডিকেটরাজ, বেআইনি নির্মাণ, স্থানীয় স্তরে দাপট— সব মিলিয়ে শহরাঞ্চলে শাসকদলের ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। দলের অনেক কাউন্সিলরই এখন ব্যক্তিগত স্তরে চাপে রয়েছেন বলে সূত্রের খবর।


দলের অন্দরে আরও একটি বড় উদ্বেগ হল সংগঠনের ভাঙন। ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, দলবদল এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বহু জায়গায় স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন কর্মীরাই। ফলে আগামী পুরভোটে সংগঠন ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে তৃণমূলের কাছে।
শুধু কলকাতা নয়, বিধাননগর, হাওড়া, আসানসোল, দুর্গাপুর, চন্দননগর ও শিলিগুড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ পুরনিগম নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে জোড়াফুল শিবিরে। বিধানসভা নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক মহলের ধারণা, শহরাঞ্চলে বিজেপির উত্থান আগামী পুরভোটের সমীকরণ পুরো বদলে দিতে পারে।
তবে তৃণমূল নেতৃত্ব প্রকাশ্যে এখনও আত্মবিশ্বাসী থাকার বার্তাই দিচ্ছে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও চাপের আবহ তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব বলছে, রাজ্যের ক্ষমতা হারানোর পর কলকাতা পুরসভা ধরে রাখা এখন তৃণমূলের কাছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লড়াই হতে চলেছে।







