পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানালেন স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন (Deepak Barman)। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক স্তরে একটি শ্রেণির পড়ুয়াদের সামগ্রিক দায়িত্ব একজন শিক্ষকের হাতে দেওয়ার ভাবনা রয়েছে রাজ্য সরকারের। শুধু বাংলা, ইংরেজি বা অঙ্কের মতো আলাদা বিষয়ের শিক্ষক নয়, একই শিক্ষককে একটি শ্রেণির পড়ুয়াদের সার্বিক শেখার অগ্রগতির দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি, পড়ুয়াদের শেখার মান ও উন্নতির ভিত্তিতে শিক্ষকদের কাজের মূল্যায়ন এবং বেতনবৃদ্ধির বিষয়টিও বিবেচনা করার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী। তবে এই প্রস্তাবগুলি কার্যকর করার চূড়ান্ত নিয়ম এখনও স্পষ্ট নয়।
বৃহস্পতিবার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদে আয়োজিত এক বৈঠকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা, পরিকাঠামো এবং প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে ২১টি জেলার প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যান এবং বিভিন্ন শিক্ষা পর্ষদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই শিক্ষক-পড়ুয়া অনুপাত কমানো, শ্রেণিভিত্তিক দায়িত্ব নির্ধারণ এবং পড়ুয়াদের শেখার অগ্রগতি পর্যালোচনার মতো বিষয় উঠে আসে বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
কেন একটি ক্লাসে একজন শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার ভাবনা?
শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের বক্তব্য, প্রাথমিক স্তরে পড়ুয়াদের বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক বা অন্যান্য বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা শিক্ষক রাখার পরিবর্তে একজন শিক্ষককে একটি শ্রেণির সামগ্রিক দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। তাঁর মতে, প্রাথমিক স্তরে পড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেছেন শিক্ষকেরা। তাই শ্রেণির প্রতিটি পড়ুয়ার শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করার দায়িত্ব নির্দিষ্ট শিক্ষকের হাতে থাকলে কাজের জবাবদিহি বাড়তে পারে।
মন্ত্রী উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছেন, একটি শ্রেণিতে ২০ জন পড়ুয়া থাকলে বছর শেষে তাদের মধ্যে কত জন পড়তে শিখল, কত জনের শেখার ঘাটতি রয়ে গেল, তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে পর্যালোচনা করতে হবে। অর্থাৎ, শুধু পাঠ্যক্রম শেষ করাই নয়, পড়ুয়ারা কতটা শিখল, সেটিকেও শিক্ষকের কাজের মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই ব্যবস্থায় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাদান, শিক্ষকদের কাজের বণ্টন এবং শ্রেণি পরিবর্তনের নিয়ম কী হবে, তা এখনও বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক-পড়ুয়া অনুপাত কমানোর কথাও জানিয়েছেন স্কুলশিক্ষামন্ত্রী। তাঁর দাবি, বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে প্রতি ২৬ জন পড়ুয়াপিছু একজন শিক্ষক রয়েছেন। মাধ্যমিক স্তরে প্রতি শিক্ষকের অধীনে পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় ৫০ থেকে ৫২।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনার মাধ্যমে এই অনুপাত কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। প্রাথমিক স্তরে একজন শিক্ষকের বিপরীতে প্রায় ২০ জন পড়ুয়া রাখার ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। মাধ্যমিক স্তরেও শিক্ষক-পড়ুয়া অনুপাত কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এই পরিবর্তন কার্যকর হলে শ্রেণিকক্ষে পড়ুয়াদের ব্যক্তিগতভাবে নজর দেওয়া এবং যাদের শেখার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে, তাদের অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে শিক্ষক নিয়োগের সংখ্যা, নিয়োগের সময়সীমা এবং নতুন অনুপাত কোন পর্যায়ে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন।
প্রাথমিক শিক্ষায় প্রস্তাবিত পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হল শিক্ষকদের কাজের মূল্যায়নের সঙ্গে পড়ুয়াদের অগ্রগতিকে যুক্ত করার ভাবনা। দীপক বর্মনের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও শিক্ষককে পরবর্তী বছরে বেতনবৃদ্ধি দেওয়ার আগে তাঁর কাজের ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে। পড়ুয়ারা প্রত্যাশিত উন্নতি না করলে তার কারণও সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে জানাতে হতে পারে।
তবে শিক্ষকদের বেতনবৃদ্ধি সরাসরি পড়ুয়াদের ফলাফলের উপর নির্ভর করবে কি না, তা এখনও চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে মূল্যায়নের মাপকাঠি, পড়ুয়াদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিস্থিতি, স্কুলের পরিকাঠামো এবং শিক্ষকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিষয়গুলি কীভাবে বিবেচিত হবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
কারণ, পড়ুয়ার শেখার অগ্রগতির পিছনে শুধু শিক্ষকের ভূমিকা নয়, নিয়মিত স্কুলে উপস্থিতি, বাড়িতে পড়াশোনার পরিবেশ, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ এবং স্কুলের পরিকাঠামোর মতো একাধিক বিষয় কাজ করে।
রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় জাতীয় শিক্ষানীতি (National Education Policy বা NEP) কার্যকর করার বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনার অংশ বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। পূর্বতন রাজ্য সরকার জাতীয় শিক্ষানীতির কয়েকটি প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। বর্তমান সরকার শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন পদ্ধতি চালুর কথা ভাবছে।
তবে জাতীয় শিক্ষানীতির কোন কোন সুপারিশ বাংলায় কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, প্রাথমিক শিক্ষায় শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষকের দায়িত্ব নির্ধারণ, শিক্ষক-পড়ুয়া অনুপাত কমানো এবং পড়ুয়াদের শেখার অগ্রগতির ভিত্তিতে শিক্ষকদের কাজের মূল্যায়ন—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে রাজ্য সরকার। প্রস্তাবগুলি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক, পড়ুয়া এবং অভিভাবক—তিন পক্ষের উপরই তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে চূড়ান্ত নিয়ম, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং বেতনবৃদ্ধির মূল্যায়ন-পদ্ধতি সম্পর্কে সরকারি ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এগুলিকে পরিকল্পনা হিসেবেই দেখা উচিত।



