বিহারের শিক্ষা দফতরের বেতন ব্যবস্থায় বড়সড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারের অভ্যন্তরীণ অডিটে পটনা, নওয়াদা ও ভাগলপুর—এই তিন জেলায় হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (Human Resource Management System বা HRMS) পোর্টারের মাধ্যমে বেতন ও ভাতা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় একাধিক গরমিল ধরা পড়েছে। কোথাও শিক্ষকের প্রাপ্য বেতনের কয়েক গুণ বেশি টাকা দেওয়ার অভিযোগ, কোথাও আবার অস্তিত্বহীন শিক্ষকের নামে প্রায় এক কোটি টাকা পাঠানোর ঘটনা সামনে এসেছে। তিনটি ঘটনায় মোট প্রায় ১ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকার অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত চলছে।
ঘটনাগুলি সামনে আসার পর পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি বিভাগীয় পদক্ষেপও শুরু হয়েছে। অন্তত চার জন আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে বেতন সংক্রান্ত ডিজিটাল নথিতে অনুমোদনহীন পরিবর্তন, লগইন তথ্যের অপব্যবহার এবং HRMS পোর্টালের মাধ্যমে সন্দেহজনক অর্থপ্রদান।
বিহারের শিক্ষামন্ত্রী মিথিলেশ তিওয়ারি (Mithilesh Tiwari) তিনটি ঘটনার কথা স্বীকার করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজ্যের ৩৮টি জেলাতেই অভ্যন্তরীণ অডিট চালানোর কথা জানিয়েছে শিক্ষা দফতর। বেতন ব্যবস্থায় অননুমোদিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষক, কর্মী বা আধিকারিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে দফতর।
নওয়াদায় কীভাবে বেতন বেড়ে গেল কয়েক গুণ?
নওয়াদা জেলার রাজৌলি এলাকার একটি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষককে ঘিরে প্রথমে বেতন সংক্রান্ত গরমিলের অভিযোগ সামনে আসে। জেলা শিক্ষা আধিকারিকের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই শিক্ষকের ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রাপ্য বেতন ছিল ৪৬,৭৭২ টাকা। কিন্তু তাঁর অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে ৪,৯১,৭৭২ টাকা। পরের মাসেও ৩,৪৯,৫০০ টাকা বেতন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ, বেতন সংক্রান্ত নথি তৈরির দায়িত্বে থাকা এক কর্মী এবং তা যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা আর এক কর্মী অনুমোদন ছাড়াই ‘অন্যান্য ভাতা’ খাতে অতিরিক্ত টাকা যুক্ত করেছিলেন। দুই মাসে ওই শিক্ষকের অ্যাকাউন্টে মোট ১০,৪৩,৯৫০ টাকা বেআইনিভাবে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ। শিক্ষক-সহ তিন জনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
পটনায় লগইন আইডি ব্যবহার করে ৭৬.৭২ লক্ষ টাকার গরমিলের অভিযোগ:
পটনা জেলাতেও বেতন পোর্টালের অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। এক জেলা শিক্ষা আধিকারিকের দাবি, তাঁর লগইন আইডি ব্যবহার করে বেতন সংক্রান্ত নথিতে অনুমোদনহীন অঙ্ক যোগ করা হয়েছিল। এই ঘটনায় প্রায় ৭৬.৭২ লক্ষ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এক কর্মীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগের তদন্ত চলছে।
ভাগলপুরে অস্তিত্বহীন শিক্ষিকার নামে প্রায় ৯৮ লক্ষ টাকা!
ভাগলপুরের ঘটনা আরও গুরুতর। তদন্তে অভিযোগ উঠেছে, HRMS পোর্টালে ‘তনুশ্রী’ নামে এক শিক্ষিকার পরিচয় তৈরি করে তাঁর নামে বেতন পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যদিও ওই শিক্ষিকার বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই ঘটনায় মোট ৯৮,১২,৭৭৩ টাকা অনিয়মিতভাবে দেওয়া হয়েছিল বলে খবর।
৮ অক্টোবর জোগসার থানায় এফআইআর দায়েরের পর শিক্ষা দফতরের দুই আধিকারিক—জেলা শিক্ষা আধিকারিক চন্দন কুমার এবং জেলা প্রোগ্রাম আধিকারিক শশীচন্দন চৌধুরী—সাসপেন্ড হন। চুক্তিভিত্তিক কম্পিউটার অপারেটর অবিনাশ রাজের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় এসেছে বলে জানা গিয়েছে।
রাজ্যজুড়ে বেতন যাচাইয়ের নির্দেশ:
এই ঘটনাগুলির প্রেক্ষিতে বিহার সরকার শিক্ষা দফতরের আধিকারিক, শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের বেতন এবং ভাতার নথি যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে। বেতন প্রক্রিয়ায় ‘মেকার’, ‘চেকার’ ও ‘অ্যাপ্রুভার’—প্রতিটি স্তরে দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হয়ে থাকলে তা ফেরত নেওয়া এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও রয়েছে।
বিহারের শিক্ষা দফতরে ছয় লক্ষেরও বেশি শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মী রয়েছেন। তাই বেতন ব্যবস্থায় এই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ শুধু সরকারি অর্থের সুরক্ষা নয়, গোটা প্রশাসনিক যাচাই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তবে অভিযোগের প্রকৃত পরিধি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় এবং অর্থের কতটা উদ্ধার সম্ভব হয়েছে—তা তদন্ত ও অডিটের পরেই স্পষ্ট হবে।



