সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলে নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ এখনই কার্যকর হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সিদ্ধান্তটি ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক দল এবং শিক্ষক সংগঠনগুলির মধ্যে মতবিরোধ সামনে এসেছে।
সরকারের বক্তব্য, স্কুলে পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত করা এবং শিক্ষকতার দায়িত্বে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ। অন্য দিকে, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও শিক্ষক সংগঠনের একাংশের প্রশ্ন, নতুন শিক্ষকদের নির্বাচনে লড়ার অধিকার সীমিত করা কতটা যুক্তিসঙ্গত? এই সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য।
নতুন নিয়োগে কী বিধিনিষেধের কথা জানাল রাজ্য?
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC) মাধ্যমে ভবিষ্যতে যাঁরা নতুন করে শিক্ষক-শিক্ষিকা পদে নিয়োগ পাবেন, তাঁরা প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশ নিতে পারবেন না। পঞ্চায়েত, পুরসভা, বিধানসভা কিংবা লোকসভা— কোনও স্তরের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগও তাঁদের থাকবে না বলে জানানো হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের বিস্তারিত বিধি, কার্যকর হওয়ার নির্দিষ্ট সময় এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতি সম্পর্কে প্রদত্ত তথ্যে আলাদা করে কিছু উল্লেখ নেই। ফলে চূড়ান্ত নিয়মের পরিধি ও প্রয়োগের বিষয়টি সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশের পরে আরও স্পষ্ট হবে।
মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, দেশের অন্য রাজ্যগুলিতেও সরকারি শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা।
সরকারের যুক্তি, শিক্ষকতার মূল দায়িত্ব পড়ুয়াদের শিক্ষা দেওয়া। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের সঙ্গে শিক্ষকতার দায়িত্বের সংঘাত তৈরি হতে পারে। সেই পরিস্থিতি এড়িয়ে স্কুলের শিক্ষার পরিবেশকে আরও উন্নত করাই এই সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।
পুরনো শিক্ষকদের ক্ষেত্রে কী হবে?
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য আপাতত কোনও পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করা হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, যাঁরা ইতিমধ্যেই শিক্ষকতার পেশায় রয়েছেন এবং রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, কিংবা জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের অধিকার এখনই খর্ব করা হচ্ছে না।
অর্থাৎ, ঘোষিত বিধিনিষেধ মূলত ভবিষ্যতে স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য প্রযোজ্য হবে। তবে পুরনো ও নতুন শিক্ষকদের ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম চালু করার আইনি ভিত্তি কী হবে, তা নিয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি।
শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং শিক্ষকতার পেশাগত দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলছে সরকার। কিন্তু শিক্ষকদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের স্বাধীনতার সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের সংঘাত তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সমালোচকদের একাংশ।
‘গণতান্ত্রিক অধিকারে কুঠারাঘাত’, সরব কংগ্রেস
রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তথা প্রাক্তন অধ্যাপক প্রদীপ ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, নতুন শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে দূরে রাখার এই সিদ্ধান্ত একতরফা এবং গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রদীপ ভট্টাচার্য সতর্ক করে বলেছেন, সরকার এই বিধিনিষেধ কার্যকর করতে গেলে তা আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি, দেশের অন্য রাজ্যগুলিতে সরকারি শিক্ষকরা প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশ নিতে পারেন না বলে মুখ্যমন্ত্রী যে দাবি করেছেন, তা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য, শিক্ষকদের রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করার আগে সংশ্লিষ্ট বিধি এবং তার আইনি ভিত্তি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনও মামলা ইতিমধ্যেই দায়ের হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রদত্ত তথ্যে কিছু জানানো হয়নি।
শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন সুজন চক্রবর্তীর
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী রাজ্য সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, সরকারি স্কুলগুলিতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার পরিকাঠামো উন্নত করার দিকে সরকারের বেশি নজর দেওয়া উচিত।
শিক্ষক-শিক্ষিকা রাজনীতি করতে পারবেন কি না, সেই বিতর্কের আগে স্কুলে শিক্ষকসংকটের সমাধান জরুরি বলে মনে করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, দেশে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ৩০:১ হওয়া উচিত। সেই লক্ষ্যে রাজ্য সরকার সফল হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন সুজন।
একই সঙ্গে স্কুল পরিচালনায় গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা এবং শিক্ষকদের উপর অশিক্ষামূলক কাজের চাপ কমানোর দাবি তুলেছেন তিনি। সুজনের অভিযোগ, শিক্ষকদের এসআইআর (SIR) কিংবা জনগণনার মতো কাজে যুক্ত করা হচ্ছে, অথচ তাঁদের প্রধান দায়িত্ব পড়ুয়াদের পড়ানো।
তাই নতুন বিধিনিষেধের ঘোষণা দিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রের মূল সমস্যাগুলি আড়াল করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন এই সিপিএম নেতা।
শিক্ষক সংগঠনগুলির বক্তব্য কী?
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডলও রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা পান না। তাই অন্য রাজ্যের সরকারি কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের তুলনা করে একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
স্বপন মণ্ডলের দাবি, শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা না দিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্য দিকে, অ্যাডভান্সড সোসাইটি ফর হেডমাস্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক চন্দন মাইতি শিক্ষকদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার বজায় রাখার পক্ষে সওয়াল করেছেন।
তাঁর মতে, শিক্ষকরা শুধু পড়ুয়াদের শিক্ষা দেন না, সমাজ গঠনের কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অতীতে শিক্ষকরা নির্বাচনে জিতে মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমান সরকারেও শিক্ষকদের বিধায়ক ও মন্ত্রী হওয়ার নজির রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
চন্দন মাইতির বক্তব্য, শিক্ষকদের ভোটে দাঁড়ানোর অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে সমাজ গঠনের কাজে তাঁদের অংশগ্রহণ সীমিত হতে পারে। তাই সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আর্জি জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, শিক্ষকদের আগে সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা দেওয়ার দাবিও তুলেছেন।
সমালোচনার পাশাপাশি রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপের সমর্থনেও বক্তব্য সামনে এসেছে। গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামান মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
তাঁর যুক্তি, একজন শিক্ষক যদি একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে দুই ক্ষেত্রের কাজের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হতে পারে। জনপ্রতিনিধিকে ২৪ ঘণ্টা মানুষের পরিষেবায় ব্যস্ত থাকতে হয়। সেই পরিস্থিতিতে শিক্ষকতার দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে তাঁর মত।
স্কুলের স্বার্থ এবং পড়ুয়াদের শিক্ষার পরিবেশের কথা মাথায় রেখে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধকে যুক্তিযুক্ত বলেই মনে করছেন আখরুজ্জামান।
নতুন শিক্ষক নিয়োগে প্রত্যক্ষ রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ঘোষণার পর বিতর্কের মূল জায়গা এখন দুটি— শিক্ষকদের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং স্কুলে শিক্ষার পরিবেশের উন্নতি। সরকারের দাবি, শিক্ষকতার দায়িত্বে আরও বেশি মনোযোগ নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ। অন্য দিকে, বিরোধী নেতা ও শিক্ষক সংগঠনের একাংশের মতে, শিক্ষক নিয়োগ, পরিকাঠামো এবং শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদার মতো সমস্যাগুলির সমাধানও সমান জরুরি।
তবে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের বিস্তারিত নির্দেশিকা, বিধিনিষেধের সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো এবং তা কার্যকর করার পদ্ধতি প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর অধরা থাকছে। বিশেষ করে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের রাজনৈতিক অধিকার কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, তা নিয়ে আইনি বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।



