পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষায় পাশ-ফেল প্রথা ফেরানোর পক্ষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগরে তিনি জানান, স্কুলে পাশ-ফেল ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন বলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন। একই সঙ্গে স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস আধুনিক পদ্ধতিতে পড়ানোর পক্ষেও সওয়াল করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, শিক্ষা দপ্তরে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে রাজ্য সরকারকে রিপোর্ট দেবেন। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে ধাপে ধাপে এই পরিবর্তনগুলি কার্যকর করার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।
তবে পাশ-ফেল প্রথা ঠিক কোন শ্রেণি থেকে ফিরবে, কীভাবে মূল্যায়ন হবে এবং নতুন নিয়ম কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা এখনও এই বক্তব্যে জানানো হয়নি।
পঞ্চম না ষষ্ঠ শ্রেণি, কোথা থেকে ফিরবে পাশ-ফেল?
স্কুলে পাশ-ফেল ফিরিয়ে আনার বিষয়টি নিয়ে রাজ্যের সিলেবাস কমিটির মধ্যেও আলোচনা চলছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বর্তমানে সরকারি ও সরকার-পোষিত স্কুলে প্রাথমিক স্তর থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রচলিত ব্যবস্থায় পাশ-ফেলের নিয়ম নেই।
শিক্ষা দপ্তর সূত্রের খবর উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেবাস কমিটির বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, প্রাথমিক স্তরকে বাদ রেখেও পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পাশ-ফেল ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
সিলেবাস কমিটির চেয়ারপার্সন দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই বিষয়ে রাজ্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। তবে প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়েছে বা সরকার তা অনুমোদন করেছে—এমন তথ্য এখনও দেওয়া হয়নি।
ফেল করলেও দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব
পাশ-ফেল প্রথা ফেরানোর আলোচনায় পড়ুয়াদের জন্য অতিরিক্ত সুযোগ রাখার বিষয়টিও উঠে এসেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা পড়ুয়াদের ফল প্রকাশের পরে আরও ১৫ দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত সময় দিয়ে বিশেষ সহায়ক ক্লাস বা রেমেডিয়াল ক্লাস করানো যেতে পারে।
এর পরে সংশ্লিষ্ট পড়ুয়াদের ফের পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। দ্বিতীয় পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে না পারলে তাঁদের একই শ্রেণিতে রেখে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হিসেবে পড়ুয়াদের শেখার ঘাটতি পূরণ এবং উন্নতির জন্য অতিরিক্ত সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে এই প্রস্তাব এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত নিয়ম কী হবে, তা রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে।
পাশ-ফেল তুলে দেওয়ার পিছনে কী ছিল যুক্তি?
পশ্চিমবঙ্গে স্কুলে পাশ-ফেল প্রথা তুলে দেওয়ার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮২ সালে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে প্রাথমিক স্তরে, অর্থাৎ চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পাশ-ফেল তুলে দেওয়া হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনও হয়েছে।
পরে ২০০৯ সালে শিক্ষার অধিকার আইন কার্যকর হওয়ার পর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ-ফেল না রাখার ব্যবস্থা দেশজুড়ে চালু হয়। এর পিছনে স্কুলছুট কমানো এবং পড়ুয়াদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার যুক্তি ছিল।
২০১৮ সালে শিক্ষার অধিকার আইনে সংশোধনের মাধ্যমে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ পড়ুয়াদের পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একই শ্রেণিতে রেখে দেওয়ার বিধান আনা হয়। তবে রাজ্যভেদে এই বিধান কার্যকর করার পদ্ধতি আলাদা হতে পারে।
পাশ-ফেল ফেরানোর পক্ষে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের একাংশের যুক্তি, নির্দিষ্ট শ্রেণি থেকে নিয়মিত মূল্যায়ন চালু হলে পড়ুয়াদের পড়াশোনার অগ্রগতি বোঝা সহজ হতে পারে। অন্যদিকে, এই ব্যবস্থার সঙ্গে সহায়ক ক্লাস ও পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ যুক্ত করা হলে পিছিয়ে পড়া পড়ুয়ারাও নিজেদের উন্নত করার সুযোগ পেতে পারে।
শুধু পাশ-ফেল নয়, স্কুলশিক্ষায় আরও কয়েকটি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। পাশাপাশি ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস আধুনিক পদ্ধতিতে পড়ুয়াদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উপরেও জোর দিয়েছেন তিনি।
তবে স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের নিষেধাজ্ঞা থাকবে, শিক্ষক ও পড়ুয়াদের জন্য আলাদা নিয়ম হবে কি না, কিংবা ইতিহাসের পাঠ্যক্রমে ঠিক কী পরিবর্তন আনা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি।
আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে ধাপে ধাপে পরিবর্তনের ইঙ্গিত থাকলেও তার আগে শিক্ষা দপ্তরের আলোচনা, বিশেষজ্ঞদের রিপোর্ট এবং রাজ্য সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নজর এখন রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তে
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে স্কুলে পাশ-ফেল ফেরানোর বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে প্রস্তাব ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোন শ্রেণি থেকে নতুন ব্যবস্থা চালু হবে, পুনরায় পরীক্ষার নিয়ম কী হবে এবং সহায়ক ক্লাস কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
শিক্ষা দপ্তর ও সিলেবাস কমিটির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে তার বাস্তবায়ন-পদ্ধতি এবং পড়ুয়াদের উপর প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।



