দুর্গাপুজোর সময় চোরবাগানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর আসন্ন উৎসবগুলির নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি সতর্ক নবান্ন। কালীপুজো, দীপাবলি, জগদ্ধাত্রী পুজো ও ছটপুজোয় যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য জেলাভিত্তিক নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বুধবার নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, প্রতি জেলার দায়িত্বে থাকবেন এক জন করে মন্ত্রী। বড় জেলার ক্ষেত্রে দু’জন মন্ত্রীকেও দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে উৎসবের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা খতিয়ে দেখবেন তাঁরা।
চোরবাগানের দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পর রাজ্য সরকার উৎসবের ভিড় নিয়ন্ত্রণ, পুজোমণ্ডপের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনার কথা জানিয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও আগেই বলেছিলেন, ওই ঘটনার তদন্তে যাঁদের দায় নির্ধারিত হবে, তাঁদের কাউকে আড়াল করা হবে না। তদন্ত কমিটির সুপারিশ প্রকাশ্যে আনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
শুধু কালীপুজো নয়, নজর থাকবে জগদ্ধাত্রী ও ছটপুজোতেও
কালীপুজো ও দীপাবলির পর রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় জগদ্ধাত্রী পুজো এবং ছটপুজো পালিত হবে। এই উৎসবগুলিতে মণ্ডপ, ঘাট এবং জনসমাগমের এলাকায় নিরাপত্তা বজায় রাখাই প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। নবান্নের নির্দেশ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জেলার মন্ত্রীরা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে প্রস্তুতির খোঁজ নেবেন।
বিশেষত ছটপুজোর সময় নদী, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয়ের ঘাটে বহু মানুষের সমাগম হয়। সেখানে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, আলো, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ এবং জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে কালীপুজোয় বড় মণ্ডপ ও আলোকসজ্জার এলাকাতেও নিরাপত্তা ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
তবে কোন জেলায় কোন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার পূর্ণ তালিকা প্রকাশ্যে এলে সেই অনুযায়ী বিস্তারিত জানা যাবে।
নতুন শিল্পনীতিতে মন্ত্রিসভার অনুমোদন
বুধবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে শুধু উৎসবের নিরাপত্তা নয়, রাজ্যের শিল্পনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। রাজ্যের নতুন শিল্পনীতির খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ৫ নভেম্বর নবান্ন থেকে এই নীতি ঘোষণা করা হতে পারে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
নতুন শিল্পনীতির লক্ষ্য রাজ্যে বৃহৎ শিল্প সংস্থাকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো বলে জানানো হয়েছে। সিঙ্গল-উইন্ডো ব্যবস্থাকে কার্যকর করা এবং জমি সংক্রান্ত বিষয়েও নতুন পদক্ষেপের ইঙ্গিত রয়েছে। তবে শিল্পনীতির পূর্ণ বিবরণ ও নির্দিষ্ট সুবিধাগুলি আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরই স্পষ্ট হবে।
রাজ্যে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো নতুন নীতির অন্যতম লক্ষ্য বলে মন্ত্রিসভার সূত্রের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের নতুন নাম ‘মুখ্যমন্ত্রী কিষাণ সম্মাননিধি’
মন্ত্রিসভার বৈঠকে কৃষকদের আর্থিক সহায়তা সংক্রান্ত প্রকল্পের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে খবর। রাজ্যের ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের নতুন নাম রাখা হচ্ছে ‘মুখ্যমন্ত্রী কিষাণ সম্মাননিধি’। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৫ নভেম্বর হুগলির পুরশুড়া থেকে প্রায় ৪৮ লক্ষ কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এককালীন ২ হাজার টাকা করে দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীর উপস্থিত থাকার কথা।
তবে এই অর্থের প্রকৃতি ও প্রকল্পের কার্যকরী শর্ত সম্পর্কে সরকারি বিজ্ঞপ্তির বিস্তারিত দেখে নেওয়া জরুরি। কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি এবং রাজ্যের কৃষক সহায়তা প্রকল্পকে এক বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না; দুটি প্রকল্পের সুবিধা ও অর্থপ্রদানের কাঠামো আলাদা হতে পারে। কেন্দ্রের পিএম-কিষান প্রকল্পে যোগ্য কৃষক পরিবারকে বছরে মোট ৬ হাজার টাকা তিন কিস্তিতে দেওয়া হয়।
বাজেট বরাদ্দ খরচে গতি আনার নির্দেশ
রাজ্যের যে দপ্তরগুলি ইতিমধ্যে বরাদ্দ বাজেটের ৩৫ শতাংশ অর্থ খরচ করেছে, তাদের পরবর্তী কিস্তির টাকা ছাড়ার জন্য অর্থ দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে খবর। এর উদ্দেশ্য সরকারি প্রকল্প ও প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়ানো। বরাদ্দ অর্থের ব্যবহার এবং পরবর্তী অর্থছাড়ের প্রক্রিয়ায় কোন দপ্তর কতটা অগ্রগতি করেছে, তার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
১১ থেকে ১৮ নভেম্বর জনজাতি গৌরব দিবস
মন্ত্রিসভার বৈঠকে জনজাতি গৌরব দিবস পালনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১১ থেকে ১৮ নভেম্বর রাজ্যে এই উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে। জনজাতি সম্প্রদায়ের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অবদানকে সামনে রেখে এই কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে বুধবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে উৎসবের নিরাপত্তা, শিল্পে বিনিয়োগ, কৃষকদের আর্থিক সহায়তা এবং সরকারি ব্যয়—একাধিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে খবর। তবে চোরবাগানের দুর্ঘটনার পর এখন নবান্নের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার আসন্ন উৎসবগুলিতে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সমন্বয় নিশ্চিত করা। জেলাভিত্তিক মন্ত্রীদের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তার উত্তর মিলবে কালীপুজো ও পরবর্তী উৎসবগুলির প্রস্তুতি এবং পরিচালনায়।



