‘হাত বাঁধা ছিল, বন্দুক কাড়ল কী করে?’ প্রহ্লাদের মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ চাইলেন মা

পুলিশের গুলিতে প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যুর পর গাইঘাটা এনকাউন্টার নিয়ে প্রশ্ন তুললেন তাঁর মা রেখা দাস। পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে পরিবারের প্রশ্নের ফারাক ঘিরে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠছে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় পুলিশের গুলিতে প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যুকে ঘিরে প্রশ্ন তুললেন তাঁর মা রেখা দাস। কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্ত প্রহ্লাদকে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের দাবি। সেই সময় তাঁর হাত বাঁধা ছিল বলেও জানিয়েছেন মা। তাঁর প্রশ্ন, হাত বাঁধা অবস্থায় কীভাবে পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে গুলি চালানো সম্ভব? ছেলের মৃত্যুর বিচার চাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণও দাবি করেছেন তিনি।

অন্যদিকে পুলিশের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণ শেষে ফেরার সময় প্রহ্লাদ এক পুলিশকর্মীর সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালান। পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে তিনি গুরুতর জখম হন। পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশের এই বক্তব্য এবং পরিবারের প্রশ্ন—দুইয়ের মধ্যেই এখন গাইঘাটা এনকাউন্টার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

বুধবার সংবাদমাধ্যমের সামনে রেখা দাস বলেন, তাঁর ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁরা ক্ষতিপূরণ চান। তাঁর বক্তব্য, কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় যেমন বিচার হওয়া দরকার, তেমনই ছেলের মৃত্যুর ঘটনাতেও ন্যায়বিচার চাইছেন তাঁরা।

রেখার দাবি, প্রহ্লাদ অপরাধ করে থাকলে আইন অনুযায়ী তাঁর শাস্তি হোক, এমনটাই চেয়েছিল পরিবার। সেই কারণে তাঁরা পুলিশকে সহযোগিতাও করেছিলেন। কিন্তু পুলিশের গুলিতে ছেলের মৃত্যু হবে, তা তাঁরা ভাবতে পারেননি।

মায়ের বক্তব্য, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য রাতে প্রহ্লাদকে বাড়িতে নিয়ে আসার সময় তাঁর হাত বাঁধা ছিল। সঙ্গে একাধিক পুলিশকর্মী ছিলেন। সেই অবস্থায় কীভাবে তিনি বন্দুক ছিনিয়ে গুলি চালালেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রেখা। তবে পরিবারের এই বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই এখনও সামনে আসেনি।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে প্রহ্লাদকে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছিল। সেই প্রক্রিয়া শেষে ফেরার পথে বৈদ্যবাড়ি এলাকার কাছে গাড়ি থামানোর অনুরোধ করেন তিনি। পুলিশের দাবি, গাড়ি থামার পর এক পুলিশকর্মীর বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে পরপর তিন রাউন্ড গুলি চালান প্রহ্লাদ।

পুলিশের দাবি আরও, গুলির মুখে এক পুলিশকর্মী জখম হন এবং অন্য এক কর্মী আত্মরক্ষার জন্য জলাশয়ে ঝাঁপ দেন। এরপর পুলিশ পাল্টা চার রাউন্ড গুলি চালায়। তাতে প্রহ্লাদ গুলিবিদ্ধ হন। তাঁকে চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

এগুলি পুলিশের দেওয়া ঘটনার বিবরণ। এনকাউন্টারের সময় ঠিক কী ঘটেছিল, বন্দুক কীভাবে অভিযুক্তের হাতে পৌঁছেছিল এবং গুলি চালানোর পরিস্থিতি কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।

রেখা দাসের দাবি, এলাকার মানুষের কাছে তাঁর ছেলের সম্পর্কে খোঁজ নিলেই অনেক কিছু জানা যাবে। পরিবারের বক্তব্য, প্রহ্লাদ শান্ত স্বভাবের ছিলেন। তিনি পুলিশের কাছ থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালিয়েছেন—এই দাবি এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না তাঁরা।

প্রহ্লাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কথা বলেছেন তাঁর মা। কিশোরী কেন রাতে তাঁর ডাকে অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল কি না, সেই বিষয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন রেখা। তবে এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর তদন্তের তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা সম্ভব। কিশোরীর সঙ্গে অভিযুক্তের পরিচয় বা সম্পর্কের ধরন কোনওভাবেই অপরাধের অভিযোগকে খাটো করে না।

স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, প্রহ্লাদ গোবরডাঙা হিন্দু কলেজে দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। পরিবারের দাবি, বিয়ের আগে নিজের বাড়ি তৈরি করার কথা বলতেন তিনি। ছেলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের কথা আগে বুঝতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন তাঁর মা।

প্রহ্লাদের মৃত্যুর পর তাঁর দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছিল। মঙ্গলবার রাতে ময়নাতদন্তের পর দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বাবা রামপ্রসাদ দাস ছেলের দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

প্রহ্লাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের গুরুত্ব স্বীকার করেও তাঁর বাবা পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনায় আপত্তি জানান। তাঁর বক্তব্য, ছেলের অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো শাস্তি হতে পারত। এভাবে মৃত্যুর ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না বলেও জানান তিনি।

পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে শোক, ক্ষোভ এবং বিচার চাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে প্রহ্লাদের বিরুদ্ধে কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগেরও বিচার হওয়া প্রয়োজন ছিল। অভিযুক্তের মৃত্যুতে সেই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, শনিবার রাতে গাইঘাটা থানা এলাকার ১৭ বছর বয়সি এক কিশোরী বাড়ির কাছের একটি জলসায় গিয়েছিল। পরিবারের সদস্য ও পরিচিতরাও সেখানে ছিলেন। রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ ফোন আসার পর সে অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে যায় বলে পরিবারের দাবি। তারপর আর বাড়ি ফেরেনি সে।

সারা রাত খোঁজাখুঁজির পর রবিবার সকালে বাড়ির কাছ থেকে কিশোরীর ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের অভিযোগ, তাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ প্রহ্লাদ দাসকে গ্রেফতার করে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচার হওয়ার আগেই পুলিশের গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়।

গাইঘাটা এনকাউন্টার নিয়ে এখন মূল প্রশ্নগুলি হল, পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কীভাবে অভিযুক্তের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছল, গুলি চালানোর আগে ও পরে ঠিক কী ঘটেছিল এবং পুলিশের ব্যবহৃত বলপ্রয়োগ পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ছিল কি না। পরিবারের দাবি, প্রহ্লাদের হাত বাঁধা ছিল; অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তিনি বন্দুক ছিনিয়ে গুলি চালিয়েছিলেন।

এই দুই বক্তব্যের মধ্যে কোনটি ঘটনার সঙ্গে মেলে, তা নির্ধারণে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, প্রাসঙ্গিক নথি, ফরেনসিক প্রমাণ এবং তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পুলিশের বক্তব্য বা পরিবারের সন্দেহের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।

প্রহ্লাদের মা রেখা দাসের ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচারের দাবি তাই নতুন করে আলোচনায় এনেছে গাইঘাটা এনকাউন্টারের পরিস্থিতি। একদিকে কিশোরীর মৃত্যুতে ওঠা গুরুতর অপরাধের অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্তের হেফাজতে মৃত্যুর পরিস্থিতি—দুই ক্ষেত্রেই সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।

 

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর