চন্দ্রনাথ রথ হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে ফের সরব হলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার বিধানসভায় নন্দীগ্রামের নবনির্বাচিত বিধায়ক হাসিরানি রথের শপথগ্রহণের পর তাঁর ছেলের খুনের প্রসঙ্গ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দুর দাবি, এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত সাত জনকে গ্রেফতার করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI)। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, খুনের জন্য কথিত দু’কোটি টাকার সুপারি কে দিয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও সামনে আসেনি।
এই প্রসঙ্গেই ক্যামাক স্ট্রিট, কালীঘাট এবং ডায়মন্ড হারবারের নাম উল্লেখ করেন শুভেন্দু। তবে এই জায়গাগুলির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগ রয়েছে বলে তাঁর ইঙ্গিতের কোনও চূড়ান্ত প্রমাণ এই বক্তব্য থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় না। তদন্তে কারও ভূমিকা প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া।
চন্দ্রনাথ রথ হত্যা মামলা নিয়ে কী বললেন শুভেন্দু?
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, হাসিরানি রথের ছেলেকে তাঁর সহযোগী হওয়ার কারণেই নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর দাবি, এই ঘটনায় শুটার এবং কথিত সুপারি কিলার-সহ সাত জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এর পরেই কথিত দু’কোটি টাকার প্রসঙ্গ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ওই টাকা কোথা থেকে এসেছিল, তা জানা গেলে তদন্তের বৃত্ত সম্পূর্ণ হবে। তিনি বলেন, “টাকা ক্যামাক স্ট্রিট থেকে এসেছিল? কালীঘাট থেকে এসেছিল? নাকি ডায়মন্ড হারবারের কেউ দিয়েছিল? এইটুকু জানা বাকি আছে।”
শুভেন্দু আরও বলেন, সিবিআই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করবে বলে তাঁর বিশ্বাস। তবে তাঁর বক্তব্যে উল্লিখিত অর্থের লেনদেন এবং নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তি বা এলাকার ভূমিকা তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না। অভিযোগ ও তদন্তের ফলাফল আলাদা বিষয়।
হাসিরানি রথকে বিচার পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস
ছেলের হত্যাকাণ্ডের পর নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হয়েছিলেন হাসিরানি রথ। বুধবার বিধানসভায় শপথ নেন তিনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। হাসিরানিকে আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, চন্দ্রনাথের হত্যার বিচার পাওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
চন্দ্রনাথ রথ শুভেন্দুর প্রাক্তন ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। ২০২৬ সালের ৬ মে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে তাঁকে গুলি করে খুন করা হয়। সেই ঘটনায় প্রথমে রাজ্য পুলিশের তদন্ত শুরু হলেও পরে মামলাটি সিবিআইয়ের হাতে যায়।
চন্দ্রনাথের মা হাসিরানি নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে বিধানসভায় প্রবেশ করেছেন। তাঁকে বিপুল ভোটে জেতানোর জন্য নন্দীগ্রামের ভোটারদের ধন্যবাদ জানান শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, এই জয়ের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা আরও বেড়েছে।
কেন নন্দীগ্রাম ছেড়েছিলেন শুভেন্দু?
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। পরে তিনি ভবানীপুর আসনটি রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দেন। সেই কারণে নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন হয় এবং বিজেপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন হাসিরানি রথ।
বুধবারের বক্তব্যে এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যাও দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রামের কিছু মানুষ অভিমান করে তাঁকে ভবানীপুর ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ভবানীপুর ছেড়ে দিলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফের ভোটে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারত বলে মনে করেছিলেন তিনি।
সেই প্রসঙ্গে মমতাকে নাম না করে কটাক্ষ করেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, “এই বয়সে আর না দাঁড়ানোই ভালো। অনেক বয়স হয়ে গিয়েছে। ৭৫ বছর বয়স হয়ে গিয়েছে। এই বয়সে বিশ্রাম নেওয়ার কথা।” এটি তাঁর রাজনৈতিক মন্তব্য; মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়স নিয়ে সরকারি তথ্যের সঙ্গে বক্তব্যটি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
‘বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক বলা হত’, সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে দাবি
রেজিনগরের উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকারের জয় নিয়েও বক্তব্য রাখেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, এতদিন বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক দল হিসেবে তুলে ধরে সংখ্যালঘু ভোটারদের দলটির থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনের ফল সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে বলে তিনি মনে করেন।
রেজিনগরে অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধাভোগী মহিলাদের প্রসঙ্গও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ওই এলাকায় প্রায় ৭০ হাজার মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন, যাঁদের মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্য। এই সংখ্যাগুলি শুভেন্দুর বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে; প্রকল্পের সরকারি পরিসংখ্যান দিয়ে আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিজেপি সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী হলেও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে যাঁদের প্রয়োজন, তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে। রেজিনগরের ফলকে সেই অবস্থানের উদাহরণ হিসেবেই তুলে ধরেন তিনি।
‘ছ’মাসে যা দেখছেন, তা চা-বিস্কুট’
বিজেপি সরকারের প্রথম কয়েক মাসের কাজ নিয়েও আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, সরকারের কাজের আসল পর্ব এখনও বাকি। ছ’মাসের কাজকে তিনি সকালের চা-বিস্কুটের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, সামনে আরও সময় রয়েছে।
সরকার কীভাবে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবে, তা দেখতে থাকার বার্তাও দেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলিকে নিজেদের মধ্যে লড়াই চালিয়ে গেলেও রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে খারাপ না হয়, সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পোস্টের প্রসঙ্গ
বিধানসভায় বক্তব্যের শেষ দিকে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি এক্স পোস্টের প্রসঙ্গ তোলেন শুভেন্দু। ওই পোস্টে বিরোধীদের হলফনামা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করা হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শুভেন্দু বলেন, বিরোধী দলনেতা এ বিষয়ে এফআইআর করলে রাজ্য সরকার মামলাটি সিআইডির হাতে তুলে দেবে। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের ঘটনা রাজ্যে না ঘটাই ভালো। তবে অভিযোগটির বিস্তারিত এবং তার ভিত্তিতে কোনও এফআইআর দায়ের হয়েছে কি না, তা আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।
বুধবারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে তাই একাধিক রাজনৈতিক বিষয় উঠে আসে—চন্দ্রনাথ রথ হত্যা মামলার তদন্ত, নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন, সংখ্যালঘু ভোট এবং রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা। তবে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কথিত অর্থের উৎস ও দায়ীদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে তদন্তকারী সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং আদালতের প্রক্রিয়ার দিকেই নজর থাকবে।



