আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় ফের বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে এল কলকাতা হাই কোর্টে। নির্যাতিতার পরিবারের দাবি, ঘটনার পর মামলা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। এমনকি তাঁর বাবাকে টাকা নিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া এবং একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে মাথায় বন্দুক ঠেকানোর মতো গুরুতর অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এগুলি নির্যাতিতার পরিবারের অভিযোগ; আদালতে এখনও এই দাবিগুলি প্রমাণিত হয়নি।
বৃহস্পতিবার আর জি কর মামলায় সিবিআইয়ের নতুন তদন্তকারী দলের রিপোর্ট নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে শুনানি হয়। এর আগে পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলার ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি, প্রমাণ নষ্টের অভিযোগ এবং ‘ধামাচাপা’র সম্ভাব্য চেষ্টা খতিয়ে দেখতে সিবিআইকে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। সেই নির্দেশের ভিত্তিতে তিন সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT গঠন করা হয়।
শুনানিতে নির্যাতিতার মা রত্না দেবনাথ ঘটনার রাতের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ঘটনার দিন তাঁরা প্রায় দু’ঘণ্টা টালা থানায় ছিলেন। মেয়ের দ্বিতীয় বার ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছিল সেই সময়। তাঁর প্রশ্ন, সেই পরিস্থিতিতে কেন গ্রিন করিডর করে মেয়ের দেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং কেন পরে বাড়ির সামনে দেহটি ফেলে রাখা হয়।
নির্যাতিতার মায়ের আরও অভিযোগ, নির্মল ঘোষ, সঞ্জীব মুখোপাধ্যায় এবং সোমনাথ দে তাঁদের বাড়িতে এসেছিলেন। সেই সময় তৎকালীন ডিসি নর্থও উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি তাঁর। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই পুলিশ আধিকারিক চলে যাওয়ার পরেও আত্মীয়দের সামনে নির্যাতিতার বাবাকে টাকা নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হল, পরিবারের দাবি অনুযায়ী, নির্যাতিতার বাবাকে একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে তাঁর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, এই অভিযোগের কথা তাঁরা তদন্তকারীদের আগেও জানিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, সিবিআই বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শোনেনি।
আর জি কর-কাণ্ডের তদন্ত নিয়ে নির্যাতিতার পরিবার প্রথম থেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে। কলকাতা হাই কোর্টে তাঁদের আবেদনের পর আদালত ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ধামাচাপা’ দেওয়ার অভিযোগ-সহ ঘটনার পরবর্তী পর্যায় খতিয়ে দেখতে সিবিআইয়ের তিন সদস্যের SIT গঠনের নির্দেশ দেয়। রাতের ঘটনা থেকে শুরু করে পরের দিন দেহ সৎকার পর্যন্ত গোটা ঘটনাক্রম নতুন করে খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে নতুন তদন্তকারী দল একাধিক ব্যক্তি ও কর্মীর বয়ান রেকর্ড করে। ঘটনার রাতে হাসপাতালের ওই ভবনে থাকা চিকিৎসক ও কর্মীদেরও ফের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পাশাপাশি ফরেন্সিক রিপোর্ট এবং ঘটনাস্থলের বিভিন্ন তথ্যও নতুন করে খতিয়ে দেখার কথা প্রকাশিত হয়েছে।
অগস্টের শুনানিতে কলকাতা হাই কোর্ট সিবিআইয়ের তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, পুরনো তদন্তের প্রভাব নতুন তদন্তেও পড়ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পরে আদালত সিবিআইকে আরও তিন সপ্তাহের মধ্যে পরবর্তী তদন্ত শেষ করে রিপোর্ট জমা দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেয়। ২৪ সেপ্টেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারিত হয়েছিল।
মূল আর জি কর ধর্ষণ-খুনের মামলায় কলকাতা পুলিশের সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে সিবিআই তদন্তভার নেওয়ার পরও তাঁকেই একমাত্র অভিযুক্ত হিসেবে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়। শিয়ালদহ আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেয়। তবে নির্যাতিতার বাবা-মায়ের দাবি, ঘটনার সঙ্গে আরও অনেকে যুক্ত থাকতে পারেন এবং গোটা ঘটনাক্রমের পূর্ণ তদন্ত প্রয়োজন।
এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে সিবিআইয়ের নতুন SIT পুনর্তদন্ত করছে। আদালত আগের তদন্তে কোনও অসঙ্গতি বা ঘাটতি রয়েছে কি না, ঘটনার পর কী হয়েছিল এবং পরিবারের তোলা অভিযোগগুলির ভিত্তি কতটা রয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে বলেছে।
অর্থাৎ, আর জি কর মামলায় মূল অপরাধের বিচারপর্বে সঞ্জয় রায়ের সাজা হয়ে গেলেও তদন্তের একটি পৃথক পর্ব এখনও চলছে। নির্যাতিতার পরিবারের সাম্প্রতিক অভিযোগগুলিও সেই পুনর্তদন্তের পরিধির মধ্যে রয়েছে। বাবাকে বন্দুক দেখানো বা মামলা প্রত্যাহারের জন্য টাকা দেওয়ার চাপের মতো অভিযোগের সত্যতা তদন্তে কী উঠে আসে, এখন সেদিকেই নজর।



