স্কুলের ৫০ মিটারের মধ্যে চিপস-বিস্কুট-বার্গারের বিক্রি বন্ধ! নতুন নিয়ম আনছে কেন্দ্র

স্কুলের আশপাশে অতিরিক্ত ফ্যাট, চিনি ও নুনযুক্ত HFSS খাবার বিক্রি ও বিজ্ঞাপনে লাগাম টানতে খসড়া প্রস্তাব করেছে FSSAI। এখনও চূড়ান্ত হয়নি নিয়ম।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

স্কুলের সামনে চিপস, ঠান্ডা পানীয়, মিষ্টি বিস্কুট থেকে শুরু করে শিঙাড়া, পিৎজা বা বার্গার—এমন খাবারের বিক্রিতে এবার লাগাম টানার পথে কেন্দ্র। স্কুলপড়ুয়াদের খাদ্যাভ্যাসে বদল আনতে স্কুল চত্বর এবং তার ৫০ মিটারের মধ্যে High Fat, Sugar and Salt বা HFSS খাবারের বিক্রি ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব করেছে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (FSSAI)। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এটি এখনও খসড়া প্রস্তাব, চূড়ান্ত নিয়ম নয়।

FSSAI-এর ২০২৬ সালের খসড়া Food Safety and Standards (Safe Food and Balanced Diets for Children in School) Amendment Regulations-এ অতিরিক্ত ফ্যাট, চিনি বা নুনযুক্ত খাবারের সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সরকারি খসড়া অনুযায়ী, নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি added fat, added sugar বা salt থাকলে সংশ্লিষ্ট খাবারকে ‘high’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাবিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, কঠিন খাবারে ১০০ গ্রামে ৪.২ গ্রামের বেশি added fat থাকলে তা ‘high fat’ এবং তরল খাবারে ১০০ মিলিলিটারে ১.৫ গ্রামের বেশি added fat থাকলে ‘high’ হিসেবে ধরা হবে। একই ভাবে কঠিন খাবারে ১০০ গ্রামে ৩ গ্রামের বেশি added sugar এবং তরল খাবারে ১০০ মিলিলিটারে ২ গ্রামের বেশি added sugar থাকলে তা ‘high sugar’ হিসেবে বিবেচিত হবে। নুনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমা রাখা হয়েছে।

FSSAI-এর এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছোটদের অল্প বয়স থেকেই তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত করা। সংস্থার CEO রাজিত পুনহানি আগেই জানিয়েছিলেন, স্কুলে ‘Eat Right’ উদ্যোগের পাশাপাশি HFSS খাবারের বিক্রি নিয়ন্ত্রণে খসড়া নিয়ম তৈরির প্রস্তাব রয়েছে।

তবে এখনই দেশের সমস্ত স্কুলের সামনে চিপস, পিৎজা বা বার্গার বিক্রি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এমনটা নয়। FSSAI-এর প্রস্তাব এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়নি। সরকারি নোটিস অনুযায়ী, খসড়া নিয়ে আপত্তি ও পরামর্শ জানানোর সুযোগ রয়েছে এবং অনলাইনে মতামত জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৯ অক্টোবর ২০২৬।

এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে স্কুলের আশপাশের খাবারের দোকান, ক্যান্টিন, স্টল এবং সংশ্লিষ্ট খাদ্য ব্যবসার উপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব দোকানে পড়ুয়াদের মধ্যে জনপ্রিয় প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, মিষ্টি পানীয় বা অতিরিক্ত নুন-চিনি-ফ্যাটযুক্ত খাবার বিক্রি হয়, তাদের ব্যবসায়িক মডেলে পরিবর্তন আনতে হতে পারে।

কেন্দ্রের এই উদ্যোগের পিছনে শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার সমস্যা বৃদ্ধিও অন্যতম প্রেক্ষাপট। World Obesity Federation-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ৫ থেকে ৯ বছর বয়সি প্রায় ১৪.৯২ মিলিয়ন এবং ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সি প্রায় ২৬.৪০ মিলিয়ন শিশু ২০২৫ সালে overweight বা obesity-র আওতায় ছিল। অর্থাৎ ৫ থেকে ১৯ বছর বয়স মিলিয়ে সংখ্যা প্রায় ৪.১৩ কোটি।

World Obesity Federation জানিয়েছে, ভারতে শিশুদের overweight ও obesity নিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। সংস্থার ২০২৬ সালের Atlas-এ শিশুদের স্থূলতা মোকাবিলায় স্কুলের খাবারের মান উন্নত করা এবং শিশুদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিপণন নিয়ন্ত্রণের মতো নীতির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে মহারাষ্ট্র ইতিমধ্যেই একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মহারাষ্ট্রের Food and Drug Administration স্কুল চত্বর এবং ৫০ মিটারের মধ্যে HFSS খাবার বিক্রি, বিনামূল্যে বিতরণ ও বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেয়। চিপস, ঠান্ডা পানীয়, ভাজাভুজি, ভাদাপাও, সমোসা-সহ বিভিন্ন ধরনের খাবার এই বিধিনিষেধের আওতায় এসেছে।

মহারাষ্ট্রে এই নিয়ম কার্যকর করার ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই পরিদর্শন ও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জুলাইয়ের শেষ থেকে অগস্টের শুরু পর্যন্ত ২৫০টি স্কুল ও স্কুল সংলগ্ন খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন চালিয়ে ১৩২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে মহারাষ্ট্রের রিপোর্টে জানানো হয়েছে।

মহারাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জও হয়েছিল। তবে বম্বে হাই কোর্ট ৫০ মিটারের মধ্যে HFSS খাবার বিক্রির বিধিনিষেধ নিয়ে করা একটি আবেদন খারিজ করে দেয় এবং বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তোলার সময় আবেদনটি আগেভাগে করা হয়েছে বলেও পর্যবেক্ষণ করে।

তবে দেশজুড়ে একই নিয়ম কার্যকর হলে বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বহু স্কুলই ঘনবসতিপূর্ণ বাজার বা আবাসিক এলাকার মধ্যে রয়েছে। ফলে স্কুলের ৫০ মিটারের মধ্যে থাকা প্রত্যেক দোকানে কোন খাবার পড়ুয়াদের জন্য বিক্রি হচ্ছে আর কোনটি সাধারণ ক্রেতার জন্য, তা আলাদা করে নজরদারি করা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে স্কুলপড়ুয়াদের খাবারের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করলে ছোটদের খাদ্যাভ্যাসে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। FSSAI-এর প্রস্তাবেও সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট সংস্থার ব্যবসা বন্ধ করার কথা নয়; বরং HFSS খাবারের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং স্কুলের পরিবেশে তার উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, এখনই স্কুলের সামনে চিপস বা ঠান্ডা পানীয় বিক্রি বন্ধ হচ্ছে না। কিন্তু FSSAI-এর খসড়া চূড়ান্ত হলে স্কুলের ৫০ মিটারের মধ্যে HFSS খাবার বিক্রি ও প্রচারের উপর নতুন বিধিনিষেধ আসতে পারে। ৯ অক্টোবর পর্যন্ত মতামত নেওয়ার পর খসড়ায় কী পরিবর্তন হয় এবং শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র কোন নিয়ম কার্যকর করে, এখন সেদিকেই নজর।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন