এবার রাজ্যের ১ লক্ষ ১০ হাজার চিকিৎসকের নথি যাচাই! ভুয়ো ডাক্তার ধরতে বড় পদক্ষেপ স্বাস্থ্য দফতরের

ভুয়ো ডাক্তারকাণ্ডের জেরে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে নথিভুক্ত প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার চিকিৎসকের ডিগ্রি ও শংসাপত্র যাচাই করবে সরকার। চিকিৎসকদের জন্য ‘নো ইওর ডক্টর’ প্রক্রিয়া চালুর ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

রাজ্যে ভুয়ো চিকিৎসক চক্রের অভিযোগের জেরে এবার বড় পদক্ষেপের পথে স্বাস্থ্য দফতর। রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে নথিভুক্ত প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার চিকিৎসকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শংসাপত্র নতুন করে যাচাই করা হবে। শুক্রবার স্বাস্থ্য ভবনে এই ঘোষণা করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। চিকিৎসকদের জন্য ‘কেওয়াইডি’ বা ‘নো ইওর ডক্টর’ প্রক্রিয়া চালুর কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে এই যাচাইয়ের নামে কোনও চিকিৎসককে অযথা হয়রানি করা হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছেন মন্ত্রী।

ভুয়ো ডাক্তারি ডিগ্রি এবং জাল নথি দেখিয়ে চিকিৎসক হিসেবে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার অভিযোগ ঘিরে গত কয়েক মাস ধরেই রাজ্যে বিতর্ক চলছে। এই ঘটনায় ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলের একাধিক পদাধিকারীর বিরুদ্ধে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটে অভিযোগও দায়ের হয়েছে। সেই আবহেই রাজ্যের সমস্ত নথিভুক্ত চিকিৎসকের তথ্য পুনরায় যাচাইয়ের সিদ্ধান্তের কথা জানাল স্বাস্থ্য দফতর।

- Advertisement -

১ লক্ষ ১০ হাজার চিকিৎসকের নথি যাচাই

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সঙ্গে স্বাস্থ্য দফতরের বৈঠকে চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত নথি পুনরায় যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১৯৯৬ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত কাউন্সিলে নথিভুক্ত চিকিৎসকদের তথ্য খতিয়ে দেখা হবে। বর্তমানে রাজ্যে প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার চিকিৎসকের নাম কাউন্সিলের তালিকায় রয়েছে।

শারদ্বতের বক্তব্য, চিকিৎসকেরা যে বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডাক্তারি ডিগ্রি পেয়েছেন, সেই সংক্রান্ত শংসাপত্র আবার যাচাই করা হবে। এই প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয়েছে ‘কেওয়াইডি’ বা ‘নো ইওর ডক্টর’। অর্থাৎ, নথিভুক্ত প্রত্যেক চিকিৎসকের পরিচয় ও শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইছে সরকার।

কীভাবে হবে নথি যাচাই?

- Advertisement -

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথায়, চিকিৎসকদের নথি যাচাইয়ের জন্য দুটি পদ্ধতি নেওয়া হবে। প্রথমত, চিকিৎসকেরা নিজেরা উপস্থিত হয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখাতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, বয়স, অসুস্থতা কিংবা দূরত্বের কারণে যাঁদের পক্ষে স্বাস্থ্য ভবন বা নির্দিষ্ট কেন্দ্রে যাওয়া সম্ভব হবে না, তাঁদের সঙ্গে ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হবে।

এই কাজের জন্য একটি বেসরকারি সংস্থার সাহায্য নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। তবে যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় চিকিৎসকদের যাতে অযথা হয়রানির মুখে পড়তে না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আশ্বাস দিয়েছেন শারদ্বত।

এ ছাড়াও যেসব চিকিৎসক মারা গিয়েছেন, বিদেশে চলে গিয়েছেন অথবা বর্তমানে দেশে থাকলেও চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁদের নামও কাউন্সিলের সক্রিয় নথিভুক্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

রেজিস্ট্রেশন শংসাপত্রের পাঁচ বছরের মেয়াদ নিয়ে বিতর্ক

চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন শংসাপত্রের বৈধতার মেয়াদ নিয়েও এ দিন গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের দেওয়া কিছু শংসাপত্রে পাঁচ বছর পর পুনর্নবীকরণের কথা উল্লেখ থাকে। কিন্তু এই মেয়াদ নির্ধারণের আইনি ভিত্তি কী, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শারদ্বত।

তাঁর বক্তব্য, নতুন নির্দেশিকা জারি না হওয়া পর্যন্ত রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সমস্ত রেজিস্ট্রেশন বৈধ থাকবে। শংসাপত্রে মেয়াদ সংক্রান্ত যা-ই লেখা থাকুক, আপাতত কোনও চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন বাতিল বলে গণ্য করা হবে না।

অন্যদিকে, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি সুদীপ্ত রায় জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের নথি নিয়মিত যাচাইয়ের ভাবনা থেকেই পাঁচ বছর পর শংসাপত্র পুনর্নবীকরণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মৃত বা বিদেশে চলে যাওয়া চিকিৎসকদের চিহ্নিত করাও ছিল এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।

কাউন্সিলের এক আধিকারিকের বক্তব্য, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মেনে চলা হবে। তবে শংসাপত্রে মেয়াদ লেখার নিয়ম প্রত্যাহার করতে হলে কাউন্সিলের বৈঠকে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রশাসনিক জটিলতা কমতে পারে।

ভুয়ো ডাক্তারকাণ্ডে আগেই তদন্ত শুরু

ভুয়ো ডাক্তারি ডিগ্রি ও জাল নথি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার অভিযোগে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে। ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি, সহ-সভাপতি, প্রাক্তন রেজিস্ট্রার, বিধায়ক-সদস্য এবং কয়েক জন আধিকারিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।

স্বাস্থ্য দফতরের বক্তব্য, চিকিৎসকদের যোগ্যতা ও রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হলে ভুয়ো পরিচয়ে চিকিৎসা করার প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি সাধারণ রোগীদেরও চিকিৎসকের পরিচয় ও যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এ দিন রাজ্যের ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বর্তমানে ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে হাওড়া, মুর্শিদাবাদ, কলকাতা এবং শহরতলির কিছু এলাকায় সংক্রমণ রয়েছে। স্বাস্থ্য দফতর পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সব মিলিয়ে ভুয়ো চিকিৎসক চক্রের অভিযোগের তদন্তের পাশাপাশি রাজ্যের চিকিৎসক-তালিকার স্বচ্ছতা বাড়াতে চাইছে স্বাস্থ্য দফতর। এখন নজর, প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার চিকিৎসকের নথি যাচাইয়ের কাজ কবে থেকে শুরু হয় এবং কত দিনে তা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর