বাম আমলের শিল্পনীতি নিয়ে মন্তব্যের জেরে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়েছেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু (Biman Bose)। প্রাক্তন দুই মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু (Jyoti Basu) ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে (Buddhadeb Bhattacharjee) ঘিরে তাঁর বক্তব্যের পর সিপিআইএমের (CPI(M)) অন্দরেও প্রশ্ন উঠেছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। এবার সেই বিতর্কের মধ্যেই ফের মুখ খুললেন প্রবীণ বাম নেতা। তাঁর দাবি, আগের দিনের বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বিমান বসু স্পষ্ট জানিয়েছেন, জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার যে শিল্পনীতি গ্রহণ করেছিল, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সেই নীতির পথ ধরেই রাজ্যে শিল্পায়নের চেষ্টা করেছিলেন। ফলে দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর শিল্পনীতি পরস্পরবিরোধী ছিল, এমন ব্যাখ্যা তিনি মানতে নারাজ।
কোন মন্তব্য থেকে জ্যোতি-বুদ্ধ বিতর্কের সূত্রপাত?
বিতর্কের সূত্রপাত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মুখ্যমন্ত্রিত্বকালে জমি অধিগ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। সেই বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে বিমান বসু বলেন, বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পনীতি গ্রহণ ও ঘোষণার সময় নেতৃত্বে ছিলেন জ্যোতি বসু।
তাঁর বক্তব্য ছিল, ওই শিল্পনীতি নিয়ে কোনও সমস্যা হয়ে থাকলে তার দায় জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন সরকারের। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সেই নীতি কার্যকর করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
এই মন্তব্যের পরেই শুরু হয় রাজনৈতিক তরজা। প্রশ্ন ওঠে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলের শিল্পায়ন ও জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত বিতর্ক থেকে তাঁকে আড়াল করতেই কি জ্যোতি বসুর সরকারের দিকে দায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে? বাম রাজনীতির অন্দরেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
‘আমার কথা বিকৃত করা হয়েছে’, দাবি বিমান বসুর
বিতর্কের পর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিমান বসু বলেন, তাঁর বক্তব্য বিকৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। জ্যোতি বসুর আমলে গৃহীত শিল্পনীতির ইতিবাচক দিকগুলি তুলে ধরাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
বামফ্রন্ট চেয়ারম্যানের বক্তব্য, জ্যোতি বসুর আমলে শিল্পের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কারণ, বড় শিল্প গড়ে তুলতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের বক্তব্যের সমর্থনে কোলাঘাট, বক্রেশ্বর ও সাঁওতালডিহির বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রসঙ্গ তোলেন বিমান বসু। সাগরদিঘি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কাটোয়া প্রকল্পের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, শিল্পায়নের উপযোগী পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই বিদ্যুৎ পরিকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
জ্যোতি বসুর নীতিতেই এগিয়েছিলেন বুদ্ধদেব, ব্যাখ্যা বাম নেতার
বিমান বসুর দাবি, জ্যোতি বসুর শিল্পনীতির সঙ্গে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শিল্পায়নের উদ্যোগের কোনও মৌলিক বিরোধ ছিল না। বরং আগের সরকারের গৃহীত নীতিকে সামনে রেখেই বুদ্ধদেব শিল্প বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করেছিলেন।
প্রবীণ বাম নেতা বলেন, কৃষিক্ষেত্রে সাফল্যকে ভিত্তি করেই শিল্পায়নের কথা বলেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বামফ্রন্ট সরকারের লক্ষ্য ছিল কৃষির উন্নতির পাশাপাশি রাজ্যে শিল্পের প্রসার ঘটানো।
বিমান বসুর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বৃহৎ শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর দাবি, শিল্পনীতি গ্রহণ করা হয়েছিল সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই।
তবে বাম আমলের শিল্পনীতি এবং বিশেষত জমি অধিগ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক মতভেদ রয়েছে। বিমান বসুর নতুন ব্যাখ্যা সেই পুরনো বিতর্ককেও ফের সামনে নিয়ে এসেছে।
সিঙ্গুর ও টাটার ন্যানো প্রকল্প নিয়েও সরব বিমান
শিল্পনীতি নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সিঙ্গুরের (Singur) প্রসঙ্গও টেনে আনেন বিমান বসু। টাটা মোটরসের (Tata Motors) ন্যানো গাড়ি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন হয়েছিল, তা নিয়েও আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য, সিঙ্গুরে যাঁরা শিল্পের জন্য জমি দিয়েছিলেন, তাঁরা শেষ পর্যন্ত কতটা উপকৃত হয়েছেন, তা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলেই বোঝা উচিত। ন্যানো প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার সময় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেই ইতিহাসও মনে রাখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিঙ্গুরের জমি আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তা, কৃষিজমি অধিগ্রহণ এবং জমিদাতাদের অধিকার—এই তিনটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘদিন বিতর্ক চলেছে।
বিতর্ক মেটাতে পারবে বিমান বসুর নতুন ব্যাখ্যা?
বিমান বসুর সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তিনি জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শিল্পনীতিকে একই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। তাঁর দাবি, জ্যোতি বসুর সরকার শিল্পনীতির ভিত্তি তৈরি করেছিল এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সেই নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন।
তবে আগের মন্তব্যে শিল্পনীতির সমস্যার দায় নির্ধারণের প্রসঙ্গ তোলায় যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, নতুন ব্যাখ্যার পর তা কতটা প্রশমিত হবে, সেটাই এখন দেখার। একই সঙ্গে সিঙ্গুরের জমি আন্দোলন ও বাম আমলের শিল্পায়নের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেল।



