‘প্রতিশ্রুতি পালন করুন’, ‘যোগ্য’ চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর দাবি মুখ্যমন্ত্রীকে

গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি পরীক্ষার প্রাথমিক ইন্টারভিউ তালিকা প্রকাশের পর যোগ্য চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীদের একাংশের নাম না থাকার অভিযোগ। বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন শুভেন্দুর দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের দাবি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

২০১৬ সালের বাতিল হওয়া নিয়োগ প্যানেলের ‘যোগ্য’ চাকরিহারা শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। নতুন করে পরীক্ষায় বসেও পাশ করতে পারেননি অনেকে। আবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন একাংশ। বৃহস্পতিবার স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC) গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি নিয়োগ পরীক্ষার প্রাথমিক ইন্টারভিউ তালিকা প্রকাশের পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীদের মধ্যে। তাঁদের দাবি, যোগ্য তালিকায় থাকা বহু শিক্ষাকর্মীর নামও এবারের তালিকায় নেই। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পুরনো প্রতিশ্রুতি পালনের দাবি জোরালো করছেন তাঁরা।

২০১৬ সালের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ প্যানেল ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বাতিল করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের নির্দেশ মেনে চাকরিপ্রার্থীদের একাংশকে নতুন করে পরীক্ষায় বসতে হয়। কিন্তু সেই পরীক্ষার পরেও সবার চাকরির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়নি। নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া, সংরক্ষণ সংক্রান্ত জটিলতা এবং সংশোধিত শূন্যপদের হিসাব—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন চাকরিহারা শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের একাংশ।

- Advertisement -

গ্রুপ-সি, গ্রুপ-ডি তালিকায় কারা ডাক পেলেন?

৫ নভেম্বর স্কুল সার্ভিস কমিশন গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে। লিখিত পরীক্ষার ভিত্তিতে প্রাথমিক ইন্টারভিউ তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপ-ডি পদে শূন্যপদ রয়েছে ৫,৪৮৮টি। এই পদের জন্য প্রায় ২৭ হাজার প্রার্থীকে পরবর্তী পর্যায়ে ডাকা হয়েছে। অন্যদিকে, গ্রুপ-সি বা ক্লার্ক পদে শূন্যপদ ২,৯৮৯টি। এই পদের জন্য প্রায় ১১ হাজার প্রার্থীকে প্রাথমিক ইন্টারভিউয়ের তালিকায় রাখা হয়েছে।

তবে এই তালিকা চূড়ান্ত নিয়োগের প্যানেল নয়। তালিকাভুক্ত প্রার্থীদের পরবর্তী পর্যায়ে মূল নথি যাচাই এবং মৌখিক ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হবে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরেই চূড়ান্ত নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ফল প্রকাশের পর থেকেই নতুন চাকরিপ্রার্থীদের পাশাপাশি চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীদের একাংশের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ‘যোগ্য গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি অধিকার মঞ্চ’-এর ঋষিরাজ মুনিয়ানের দাবি, যোগ্য তালিকায় থাকা প্রায় ১,৬০০ শিক্ষাকর্মীর নাম নতুন প্রাথমিক ইন্টারভিউ তালিকায় নেই। তাঁর বক্তব্য, চাকরি হারানোর পর থেকেই বেতন বন্ধ। নতুন পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর যে সামান্য আশাটুকু ছিল, সেটাও অনেকের ক্ষেত্রে শেষ হয়ে গেল।

- Advertisement -

মুখ্যমন্ত্রীর পুরনো প্রতিশ্রুতি মনে করাচ্ছেন চাকরিহারারা

বিরোধী দলনেতা থাকার সময়ে শুভেন্দু অধিকারী যোগ্য চাকরিহারাদের পাশে দাঁড়ানোর এবং তাঁদের তালিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে দাবি করছেন আন্দোলনকারীরা। এখন তিনি মুখ্যমন্ত্রী। তাই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি তুলছেন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের একাংশ।

ঋষিরাজ মুনিয়ানের কথায়, যাঁরা কোনও অন্যায় করেননি, তাঁদের কেন চাকরি হারানোর পাশাপাশি নতুন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ার কারণে আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হবে? তাঁর দাবি, যে প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তা পূরণ করা উচিত।

চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীদের বক্তব্য, তাঁদের অনেকেরই বয়স বেড়ে গিয়েছে। নতুন করে চাকরির পরীক্ষায় বসে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগও সীমিত। কেউ পরীক্ষায় পাশ করতে পারেননি, আবার কেউ বয়সের কারণে ভবিষ্যতে আর নিয়োগের সুযোগ পাবেন না। ফলে তাঁদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা না হলে বহু পরিবার আরও বিপাকে পড়বে।

চাকরি হারিয়ে কলের মিস্ত্রির কাজ, তবু আশা ছিল

মেদিনীপুরের খেজুরির বাসিন্দা সন্দীপকুমার দাসের অভিজ্ঞতাও সেই অনিশ্চয়তার ছবি তুলে ধরছে। পুরুলিয়ার একটি স্কুলে শিক্ষাকর্মীর চাকরি পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ২০১৬ সালের প্যানেল বাতিল হওয়ার পর সেই চাকরি চলে যায়। সংসার চালাতে পরে কলের মিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ফের সুযোগ পাওয়ার আশায় ছিলেন।

কিন্তু বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রাথমিক ইন্টারভিউ তালিকায় নিজের নাম দেখতে পাননি বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, এখন আর নতুন করে কিছু বলার নেই। আগে যা কাজ করছিলেন, সেটাই চালিয়ে যেতে হবে।

শিক্ষকরাও চাইছেন যোগ্যদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা

শিক্ষাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন যোগ্য তালিকায় থাকা শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। ‘যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চ’-এর রাকেশ আলমের বক্তব্য, শুরু থেকেই তাঁরা যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী দলনেতা থাকার সময়ে শুভেন্দু অধিকারী যোগ্যদের তালিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সেই উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

রাকেশের বক্তব্য, যাঁরা নতুন পরীক্ষায় পাশ করতে পারেননি অথবা বয়সসীমা পেরিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়েও সরকারের ভাবা প্রয়োজন। প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও ভাবছেন আন্দোলনকারীরা।

নিয়োগ প্রক্রিয়া এগোলেও অনিশ্চয়তা থাকছেই

২০১৬ সালের নিয়োগ প্যানেল বাতিলের পর নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলেও সব চাকরিহারার সমস্যার সমাধান হয়নি। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশোধিত সংরক্ষণ বিধি মেনে নতুন করে কাউন্সেলিংয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে। অন্যদিকে, শিক্ষাকর্মীদের ক্ষেত্রেও নতুন পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর প্রাথমিক ইন্টারভিউ তালিকা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু যাঁরা নতুন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি, যাঁদের নাম অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে কিংবা যাঁরা বয়সের কারণে আর পরীক্ষায় বসার সুযোগ পাবেন না, তাঁদের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। তাই নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার পাশাপাশি পুরনো প্যানেলের যোগ্য চাকরিহারাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলছেন আন্দোলনকারীরা।

এখন দেখার, চাকরিহারা শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের এই দাবির প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার কী পদক্ষেপ করে। তাঁদের বক্তব্য, শুধু নিয়োগের নতুন তালিকা প্রকাশ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; যাঁরা যোগ্য হয়েও চাকরি হারিয়েছেন, তাঁদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর