নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) অন্দরের মতপার্থক্য নিয়ে তদন্তমূলক রিপোর্ট প্রকাশের পর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি নিশানা করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বৈঠকে তাঁর অভিযোগ, ‘ভোট চুরি’র মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও সংবিধানের ভিত্তিকেই দুর্বল করা হয়েছে। জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগের দাবি জানানোর পাশাপাশি তাঁকে ‘রাজসাক্ষী’ হওয়ার কথাও বলেন তিনি।
রাহুলের এই আক্রমণের ঠিক আগেই দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু (Sukhbir Singh Sandhu) এবং বিবেক জোশী (Vivek Joshi) গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। নতুন ভোটার যুক্ত করা, ভোটার বাদ দেওয়া, ভোটার তালিকার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ এবং SIR-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত—একাধিক বিষয়েই তাঁদের আপত্তির কথা প্রকাশ্যে এসেছে।
রাহুলের বক্তব্য, নির্বাচনই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। মানুষের ভোটের উপর ভিত্তি করেই সংবিধান তার শক্তি পায়, সেই সংবিধানের ভিত্তিতে আইন তৈরি হয় এবং আইন থেকেই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি কাজ করে। তাঁর অভিযোগ, ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হলে তার প্রভাব শুধু একটি নির্বাচনের ফলাফলে সীমাবদ্ধ থাকে না; গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর তার প্রভাব পড়ে।
বৃহস্পতিবারের সাংবাদিক বৈঠকে রাহুল বলেন, ২০২৩ সাল থেকেই তিনি ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলে আসছেন। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং একাধিক বিধানসভা নির্বাচনেও ভোটার তালিকা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। তবে এগুলি রাহুল গান্ধী ও বিরোধীদের রাজনৈতিক অভিযোগ; এগুলিকে কোনও আদালতের প্রতিষ্ঠিত রায় হিসেবে দেখা যায় না।
জ্ঞানেশ কুমারকে উদ্দেশ করে আরও কড়া বার্তা দেন কংগ্রেস নেতা। তাঁর বক্তব্য, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার একজন ‘বুদ্ধিমান মানুষ’ এবং দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে তাঁর উচিত সত্য প্রকাশ করা। সেই সূত্রেই জ্ঞানেশকে ‘রাজসাক্ষী’ হওয়ার কথা বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
রাহুলের অভিযোগের সবচেয়ে তীব্র অংশ ছিল ‘দেশদ্রোহী’ মন্তব্য। তাঁর বক্তব্য, মানুষের ভোট কেড়ে নেওয়া হয়ে থাকলে সেটি শুধু নির্বাচনী অনিয়ম নয়, দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং সংবিধানের উপর আঘাত। এই প্রসঙ্গেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহী’ শব্দটি ব্যবহার করেন তিনি। এটি রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ, কোনও বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়।
রাহুলের বক্তব্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে নির্বাচন কমিশনের অন্দরমহলের সেই নথিগুলি, যেগুলি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর তদন্তে সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই নির্বাচন কমিশনার একাধিক ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যেগুলি তাঁদের দাবি অনুযায়ী তাঁদের জ্ঞাতসারে বা অনুমোদন ছাড়াই নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের আপত্তির বেশ কিছু কপি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছেও পাঠানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে অন্যতম বিতর্কিত বিষয় ভোটার হওয়ার আবেদনপত্র Form 6। তদন্তে উঠে এসেছে, নতুন ভোটারদের জন্য ব্যবহৃত এই ফর্মে SIR-এর আগের ভোটার তালিকায় আবেদনকারী অথবা তাঁর বাবা-মা কিংবা ঠাকুর্দা-ঠাকুমার নাম ছিল কি না—এমন একটি নতুন প্রশ্ন যুক্ত করা হয়েছিল। বিবেক জোশী মে মাসেই নথিভুক্ত আপত্তিতে জানিয়েছিলেন, সংশ্লিষ্ট নিয়ম পরিবর্তন না করে এইভাবে Form 6 বদলানো যায় না। পরে সুখবীর সিংহ সঁধুও ওই পরিবর্তনকে ‘অনুমোদনহীন’ ও ‘বেআইনি’ বলে আপত্তি জানান।
ভোটার তালিকার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই কমিশনারের উদ্বেগের কথা সামনে এসেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিবেক জোশী ‘electoral roll database’-এর ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয়করণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং ভোটার ডেটাবেসে পরিবর্তন করার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট আইনসিদ্ধ কর্তৃপক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়ে অডিটের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সুখবীর সিংহ সঁধুও পরে রাজ্যস্তরের আধিকারিকদের ERONet-এ পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
পশ্চিমবঙ্গের SIR-ও এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, SIR প্রক্রিয়ায় রাজ্যে ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২২ লক্ষেরও বেশি ভোটার নাম পুনর্বহালের আবেদন করেছেন। মোট আপিলের সংখ্যা ৩৮ লক্ষের বেশি। এই আপিল প্রক্রিয়ায় কারা এবং কোন কর্তৃত্বে কিছু ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করেছিল, তা নিয়েও নির্বাচন কমিশনের ভিতরে প্রশ্ন উঠেছিল বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাহুল গান্ধী এই ঘটনাগুলিকেই বৃহত্তর ‘ভোট চুরি’র অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনী ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটির ভিতরেই যদি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। সেই কারণেই জ্ঞানেশ কুমারের পদে থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
এর পাশাপাশি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ও আইনসভার বৈধতা নিয়েও বিস্ফোরক দাবি করেন রাহুল। তাঁর যুক্তি, যদি কোনও জনপ্রতিনিধি ‘চুরি করা ভোটে’ নির্বাচিত হয়ে থাকেন, তাহলে সেই প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তৈরি আইন ও প্রতিষ্ঠান নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। এই প্রসঙ্গে তিনি ২০২৩ সালের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন এবং নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষার বিষয়টি সামনে আনেন।
রাহুলের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্তাদের আইনি সুরক্ষা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কমিশনের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাঁর বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মোদী ও অমিত শাহের নামও আসে। ২০২৩ সালের আইনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের জন্য যে কমিটি তৈরি হয়েছে, তাতে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকেন।
বৃহস্পতিবারের সাংবাদিক বৈঠকে রাহুল একটি উপস্থাপনাও করেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ এবং জ্ঞানেশ কুমারের পাশাপাশি শিল্পপতি গৌতম আদানি, আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং প্রধানমন্ত্রীর দফতরের প্রধান সচিব পিকে মিশ্রের ছবি দেখানো হয়। রাহুল তাঁদের ‘চক্রান্তকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ তোলেন এবং নির্বাচনী ব্যবস্থায় বৃহত্তর প্রভাবের দাবি করেন।
এদিকে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিও বিরোধী দলগুলির মধ্যে জোরালো হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বরের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিরোধীরা সংসদের উভয় কক্ষে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের প্রস্তাবের জন্য নতুন করে নোটিস দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই উদ্যোগ সফল করতে সংসদীয় নিয়ম ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে বিতর্কের কেন্দ্র এখন শুধু ‘ভোট চুরি’ নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগ নয়। নির্বাচন কমিশনের ভিতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ, SIR-এ নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং দুই নির্বাচন কমিশনারের লিখিত আপত্তি—সবকটি প্রশ্নই সামনে এসেছে। একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে পাল্টা দাবি করা হয়েছে, SIR-সহ কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি তিন সদস্যের অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছে এবং সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত ছিল। অর্থাৎ, অভ্যন্তরীণ আপত্তির নথি প্রকাশ্যে এলেও তার ব্যাখ্যা নিয়ে এখনও তীব্র মতবিরোধ রয়েছে।
রাহুল গান্ধীর বৃহস্পতিবারের বার্তার রাজনৈতিক সারকথা অবশ্য স্পষ্ট—‘ভোট চুরি’র অভিযোগের তদন্ত না করে এই বিতর্ক থামবে না। আর সেই তদন্তের কেন্দ্রে তিনি রাখতে চাইছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকেই।



