মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের নির্ধারিত উত্তরপ্রদেশ সফর স্থগিত হয়েছে। মিরাট ও বারাণসীতে তাঁর দুটি কর্মসূচি হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, স্থানীয় পরিস্থিতি, লজিস্টিক-সহ একাধিক প্রশাসনিক কারণে কর্মসূচি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, সাম্প্রতিক বিতর্কের সঙ্গে সফর স্থগিতের কোনও যোগ নেই।
তবে বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক চাপ ইতিমধ্যেই বেড়েছে। নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর একাধিক লিখিত আপত্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করেছে বিরোধীরা। এর মধ্যেই শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, তাঁর পদত্যাগের দাবিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পথে নামে কংগ্রেস। দিল্লি, কলকাতা, গুয়াহাটি, পটনা, চণ্ডীগড়, জম্মু-সহ একাধিক জায়গায় বিক্ষোভের খবর পাওয়া গিয়েছে।
কেন স্থগিত জ্ঞানেশের উত্তরপ্রদেশ সফর?
নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, ২১ সেপ্টেম্বরই উত্তরপ্রদেশের মিরাট ও বারাণসীর কর্মসূচি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে ইমেলের মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়। ফলে ২৩ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনটির আগে থেকেই সফর স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে কমিশনের বক্তব্য।
মিরাট ও বারাণসীতে তরুণ ভোটারদের নিয়ে Electoral Literacy Club-এর কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা ছিল জ্ঞানেশ কুমারের। এই ধরনের কর্মসূচিতে বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী অংশ নেন। কমিশন সূত্রের বক্তব্য, আবহাওয়া, স্থানীয় পরিস্থিতি, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ও অন্যান্য লজিস্টিক বিবেচনা করে এই ধরনের কর্মসূচির সময়সূচি বদলানো হতে পারে।
জ্ঞানেশ কুমারের ভুটান সফরের কারণেও তাঁর কিছু কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে কমিশন সূত্রে জানানো হয়েছে।
দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি ঘিরে কী বিতর্ক?
বিতর্কের সূত্রপাত একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনের পর। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের আপত্তির বিষয়গুলির মধ্যে ছিল ভোটার তালিকায় নতুন নাম সংযোজন, নাম বাদ দেওয়া ও পুনরায় অন্তর্ভুক্তি, Form 6-এর পরিবর্তন এবং ভোটার ডেটাবেস ব্যবস্থাপনা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের ভোটার ডেটাবেস ও সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ আরও বেশি কেন্দ্রীয়করণের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছিলেন দুই কমিশনার। কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের বক্তব্য ছিল, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত তাঁদের জানানো বা অনুমোদন নেওয়া ছাড়াই কার্যকর করা হয়েছিল।
তবে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের সূত্রগুলি অন্য বক্তব্য দিয়েছে। কমিশনের তরফে বলা হয়েছে, SIR-সহ কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি তিন কমিশনারের অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছে এবং মতামতের পার্থক্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ deliberation-এর স্বাভাবিক অংশ।
অর্থাৎ, দুই কমিশনারের লিখিত আপত্তির বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই বিতর্কের চূড়ান্ত মূল্যায়ন এখনও হয়নি।
ইস্তফা চেয়ে পথে কংগ্রেস
এই বিতর্কের মধ্যেই জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে আন্দোলনে নামে কংগ্রেস। দিল্লির পাশাপাশি কলকাতা, গুয়াহাটি, পটনা, চণ্ডীগড়, লখনউ, জম্মু-সহ একাধিক শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। কিছু জায়গায় পুলিশ ব্যারিকেড করে আন্দোলনকারীদের আটকানোর চেষ্টা করে এবং জলকামান ব্যবহার করা হয়।
কলকাতাতেও কংগ্রেস কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরের দিকে মিছিল এগোয় বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ভোটার তালিকা নিয়ে তাঁর দল যে অভিযোগ তুলছে, তা নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তবে কংগ্রেসের এই অভিযোগগুলি রাজনৈতিক দাবি হিসেবেই রয়েছে। ভোট কারচুপি বা ‘ভোটচুরি’র অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা সংশ্লিষ্ট রিপোর্টগুলিতে নেই।
এদিকে কংগ্রেসের পাশাপাশি ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-ও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে। দলটি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইস্তফা না দিলে দেশজুড়ে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
ফলে একদিকে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়ে প্রকাশিত রিপোর্ট, অন্যদিকে কমিশনের সেই ব্যাখ্যা খারিজ করে বিরোধীদের রাজনৈতিক আক্রমণ—দুইয়ের মাঝে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। আর ঠিক এই সময়েই তাঁর উত্তরপ্রদেশের নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কমিশন অবশ্য স্পষ্ট করেছে, সফর বাতিলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাম্প্রতিক বিতর্কের কোনও সম্পর্ক নেই।



