অভিষেকের বাড়ির গার্ডরেলে গাড়ির ধাক্কা, চাকরি খোয়ানো পুলিশকর্মীকে ফের নিয়োগের নির্দেশ হাই কোর্টের

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ির সামনে গাড়ি সরাতে গিয়ে গার্ডরেলে ধাক্কার ঘটনায় বরখাস্ত হওয়া পুলিশকর্মীর চাকরি নিয়ে চার সপ্তাহের মধ্যে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে বলল হাই কোর্ট।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে গাড়ি সরাতে গিয়ে গার্ডরেলে ধাক্কার ঘটনায় চাকরি হারানো কলকাতা পুলিশের এক কর্মীর পাশে দাঁড়াল কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court)। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ভুল হয়ে থাকলেও তার জন্য সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত করার মতো শাস্তি কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চার সপ্তাহের মধ্যে ওই পুলিশকর্মীর চাকরি ফেরানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে।

মামলাটি করেছিলেন কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন গাড়িচালক ধীরেন্দ্রনাথ মাহাতো। হাই কোর্টের নথিতেও Dhirendranath Mahato vs State of West Bengal and Others নামে তাঁর মামলা নথিভুক্ত রয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে। ধীরেন্দ্রনাথকে কলকাতার হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির কাছে একটি মোবাইল টয়লেট ভ্যান সংক্রান্ত ডিউটিতে রাখা হয়েছিল। সেই সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ ভ্যানটি থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর অভিযোগ তুলে আপত্তি জানাচ্ছিলেন বলে আদালতে ধীরেন্দ্রনাথের তরফে দাবি করা হয়।

পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সময় ভ্যানটির চালক সেখানে ছিলেন না। ফলে গাড়িটি সরানোর দায়িত্ব তিনি নিজেই নেন বলে তাঁর বক্তব্য। সেই সময় গাড়িটি পিছনে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল হয়ে যায় এবং সেটি বাড়ির সামনের গার্ডরেলে ধাক্কা মারে। ধাক্কার অভিঘাত বাড়ির প্রবেশপথের সঙ্গেও লাগে বলে মামলায় জানানো হয়েছে।

এই ঘটনার পরেই তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। পরে সেই সাসপেনশন প্রত্যাহার হলে তিনি কাজে যোগ দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ফের তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়।

২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তাঁকে শো-কজ নোটিস দেওয়া হয়। কেন তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেই কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন তিনি।

মামলাটির শুনানিতে বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি পার্থপ্রতিম রায়ের ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীর ভুল হয়েছিল—এটি আদালত অস্বীকার করছে না। কিন্তু সেই ভুলের মাত্রা এমন ছিল কি না, যার জন্য চাকরি চলে যাবে, সেটিই মূল প্রশ্ন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওই ঘটনায় কারও শারীরিক আঘাত পাওয়ার অভিযোগ নেই। ফলে সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে লঘু ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল। শুধুমাত্র গাড়ি সরানোর সময় ভুলের কারণে সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তের জন্য যথেষ্ট কারণ থাকা প্রয়োজন বলেই আদালত মনে করেছে।

এই অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চার সপ্তাহের মধ্যে ধীরেন্দ্রনাথ মাহাতোর চাকরি পুনর্বহাল করা হবে কি না, সে বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ আদালতের নির্দেশে তাঁর চাকরি ফেরার পথ তৈরি হলেও, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াটি এখনও সম্পূর্ণ হওয়া বাকি।

মামলায় ধীরেন্দ্রনাথের পক্ষে সওয়াল করেন আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য এবং শতাব্দী দাস। দীর্ঘদিন কলকাতা পুলিশে কাজ করার পর একটি গাড়ি সরানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাকরি হারানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন।

ধীরেন্দ্রনাথ ২০০০ সালে কলকাতা পুলিশে গাড়িচালক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। ২০০৫ সালে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ওই ঘটনাই পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপ এবং চাকরিচ্যুতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

হাই কোর্টের এই পর্যবেক্ষণের মূল প্রশ্ন তাই শুধু একটি গাড়ি দুর্ঘটনার ঘটনা নয়; বরং কোনও সরকারি কর্মীর ভুলের জন্য শাস্তির মাত্রা নির্ধারণে সেই ভুলের প্রকৃতি, তার পরিণতি এবং শাস্তির আনুপাতিকতা কতটা বিবেচনা করা হয়েছে, সেটিও সামনে এসেছে। ধীরেন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আদালতের নির্দেশ মেনে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন