‘বন্দে মাতরম্’ গাইতে অস্বীকার করলেই কি কাউকে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত করা যাবে? মঙ্গলবার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নই উঠে এল সুপ্রিম কোর্টে। কর্নাটকি সঙ্গীতশিল্পী টিএম কৃষ্ণর (T M Krishna) করা মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের (Surya Kant) নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ মৌখিক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, কোনও নাগরিক বিবেক বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে জাতীয় গান না গাইলে তাঁকে শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি আলাদা করে খতিয়ে দেখা দরকার।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Joymalya Bagchi) এবং বিচারপতি ভি মোহনার (V. Mohana) বেঞ্চ স্পষ্ট করেছে, ‘জাতীয় গান’-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা আদালতের কাজ নয়। তবে কোনও ব্যক্তি নিজের বিবেকগত কারণে গানটি গাইতে না চাইলে তাঁকে জোর করা যায় কি না, সেই সাংবিধানিক প্রশ্ন আদালত বিবেচনা করতে পারে।
এই প্রসঙ্গে ১৯৮৬ সালের বিজোই ইমানুয়েল (Bijoe Emmanuel) মামলার কথাও উঠে আসে। সেই মামলায় ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কেরলের একটি স্কুলে জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’ না গাওয়া তিন পড়ুয়াকে সুপ্রিম কোর্ট সুরক্ষা দিয়েছিল। আদালত বলেছিল, তাঁরা সম্মান প্রদর্শন করলেও গান না গাওয়ার কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।
‘বন্দে মাতরম্’ নিয়ে বর্তমান মামলাটি মূলত কেন্দ্রের ছয় স্তবক গাওয়ার নির্দেশ এবং সম্প্রতি বদলানো আইনি কাঠামোকে ঘিরে। টিএম কৃষ্ণ তাঁর আবেদনে কেন্দ্রের নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, গানটির পরের কয়েকটি স্তবকে হিন্দু ধর্মীয় দেবদেবীর উল্লেখ রয়েছে। তাই সম্পূর্ণ গান বাধ্যতামূলক করা হলে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন উঠতে পারে।
আবেদনকারীর হয়ে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী এস মুরলীধর (S Muralidhar)। তাঁর বক্তব্য, জাতীয় প্রতীক বা জাতীয় গানের মর্যাদা রক্ষা করা এক বিষয়, কিন্তু কোনও নাগরিককে তাঁর বিবেকের বিরুদ্ধে গান গাইতে বাধ্য করা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন। এই জায়গাতেই বিজোই ইমানুয়েল মামলার রায় গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি আদালতের সামনে যুক্তি দেন।
শুনানিতে কেন্দ্রের পক্ষে ছিলেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা (Tushar Mehta)। শুনানির এক পর্যায়ে আইন প্রণয়নের সাংবিধানিক পদ্ধতি নিয়ে তাঁর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে মুরলীধরের সঙ্গে তর্ক হয়। ‘নকশাল’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি জানান মুরলীধর এবং মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি তোলেন। তবে বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, এই বাগ্বিতণ্ডার মন্তব্যগুলি নথিভুক্ত করা হবে না।
এদিকে, সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই মামলায় জবাব চেয়েছে। তবে আদালত আনুষ্ঠানিক নোটিস জারি করেনি। কেন্দ্রকে দুই সপ্তাহের মধ্যে অবস্থান জানাতে বলা হয়েছে বলে মঙ্গলবারের শুনানি নিয়ে প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই মামলার পিছনে রয়েছে ২০২৬ সালের ‘Prevention of Insults to National Honour (Amendment) Act’। সংসদে বিলটি রাজ্যসভায় ২৯ জুলাই এবং লোকসভায় ৩০ জুলাই পাশ হয়। পরে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর (Droupadi Murmu) সম্মতির পর এটি আইনে পরিণত হয়েছে। নতুন আইনে ‘বন্দে মাতরম্’-কে জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’-এর মতোই আইনি সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।
তবে এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য। সংশোধিত আইনে ইচ্ছাকৃত ভাবে জাতীয় গান গাওয়া আটকানো বা সেই গান গাওয়ার জন্য আয়োজিত কোনও সভায় ইচ্ছাকৃত ভাবে বাধা সৃষ্টি করাকে অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে। এই অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা দু’টিই হতে পারে। অর্থাৎ আইনটির ভাষা সরাসরি ‘গান না গাওয়া’-কে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে না।
এই কারণেই মঙ্গলবারের শুনানিতে ‘গান গাইতে অস্বীকার’ এবং ‘গান গাওয়ায় বাধা দেওয়া’—এই দুই আচরণের মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণও আপাতত এই সীমারেখা নিয়েই। চূড়ান্ত ভাবে বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তা পরবর্তী শুনানি ও আদালতের নির্দেশের উপর নির্ভর করবে।
কেন্দ্রের নির্দেশিকায় সরকারি অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ছয়টি স্তবক গাওয়ার প্রোটোকল নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’ অনুষ্ঠান শেষে গাওয়া যেতে পারে বলেও ওই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে বলে মামলাটির শুনানিতে বিষয়টি উঠে এসেছে। এই নির্দেশিকাকেই আইনি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন টিএম কৃষ্ণ।
ফলে মঙ্গলবারের শুনানির পর মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, সরকারি অনুষ্ঠানে বন্দে মাতরম্ গাওয়ার নির্ধারিত প্রোটোকল এবং নতুন আইনে জাতীয় গানের সুরক্ষা—এই দুইয়ের প্রয়োগের সীমা কোথায়। বিশেষ করে কোনও ব্যক্তি ধর্মীয় বা বিবেকগত কারণে গানটি না গাইলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কি না, সেই প্রশ্নেই এখন কেন্দ্রের জবাবের দিকে নজর সুপ্রিম কোর্টের।



