আরজি করের চিকিৎসক-পড়ুয়ার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর দেহ সৎকার নিয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্তে নতুন পদক্ষেপ। পানিহাটি পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সোমনাথ দে-কে দু’দিনের সিবিআই হেফাজতে পাঠিয়েছে শিয়ালদহ আদালত। বুধবার, ২৮ অক্টোবর সিবিআই তাঁর হেফাজত চেয়ে আবেদন জানায়। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছে। নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবী অমর্ত্য দে-র অভিযোগ, সোমনাথের জামিনের আবেদন কলকাতা হাই কোর্টে বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও সেই তথ্য গোপন রেখে নিম্ন আদালতে জামিনের আবেদন করা হয়েছিল।
সোমনাথ দে-র বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০২৪ সালে আরজি করের চিকিৎসক-পড়ুয়ার মৃত্যুর পর তাঁর দেহ দ্রুত সৎকারের ঘটনায় তিনি যুক্ত ছিলেন এবং তাতে তথ্যপ্রমাণ নষ্টের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এই অভিযোগ নির্যাতিতার পরিবারের তরফে তোলা হয়েছে। অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এখনও বিচারপ্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হয়নি।
কেন সিবিআই হেফাজতে নেওয়া হল সোমনাথকে?
সোমনাথ দে-কে প্রথমে গ্রেপ্তার করেছিল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। নির্যাতিতার বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে খড়দহ থানায় একটি নতুন মামলা দায়ের হয়েছিল। সেই মামলায় পানিহাটির প্রাক্তন বিধায়ক নির্মল ঘোষ, প্রাক্তন কাউন্সিলর সঞ্জীব মুখোপাধ্যায় এবং সোমনাথ দে-র নাম ছিল। অভিযোগের মূল বিষয় ছিল, নির্যাতিতার দেহ সৎকারের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং তথ্যপ্রমাণ নষ্টের সম্ভাবনা।
সোমনাথকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বেঙ্গালুরু থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার পর তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে আনা হয় এবং আদালতের নির্দেশে হেফাজতে রাখা হয়। পরে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে খড়দহ থানায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত সিবিআইয়ের তদন্তকারী দলের হাতে যায়। ১ অক্টোবরের নির্দেশে হাই কোর্ট জানায়, একই ঘটনার বিষয়ে রাজ্য পুলিশের পৃথক তদন্ত না চালিয়ে সিবিআইয়ের অধীনে থাকা বিশেষ তদন্তকারী দলই বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।
সেই প্রেক্ষিতেই এবার সোমনাথ দে-কে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পেল সিবিআই। তদন্তকারীরা কোন কোন বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করবেন, তার পূর্ণ বিবরণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
আরজি করের চিকিৎসক-পড়ুয়ার মৃত্যুর পর দেহ দ্রুত সৎকার করা হয়েছিল বলে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যেরা। পরিবারের অভিযোগ, তাঁদের সম্মতি ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই দেহ সৎকার করা হয়। সেই ঘটনার সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন এবং কোনও তথ্যপ্রমাণ নষ্ট হয়েছিল কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছিল।
২০২৬ সালের ৯ আগস্ট নির্যাতিতার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পানিহাটিতে আয়োজিত স্মরণসভায় রাজ্য সরকারের তরফে এই অভিযোগ খতিয়ে দেখার কথা জানানো হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এরপর নির্যাতিতার বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে খড়দহ থানায় নতুন মামলা দায়ের হয়।
এই মামলায় নির্মল ঘোষ ও সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়কেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়েছে। তবে প্রত্যেক অভিযুক্তের ক্ষেত্রে অভিযোগ ও আইনি অবস্থান আলাদা করে দেখা জরুরি।
শিয়ালদহ আদালতের শুনানিতে নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবী অমর্ত্য দে অভিযোগ করেন, সোমনাথ দে কলকাতা হাই কোর্টে জামিনের আবেদন করেছেন। সেই আবেদন বিচারাধীন থাকার বিষয়টি নিম্ন আদালতে যথাযথভাবে জানানো হয়নি বলে তাঁর দাবি। আদালতের সামনে এই বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
জামিনের আবেদন নিয়ে অভিযোগ এবং আদালতে হেফাজতের আবেদন—দুটি আলাদা আইনি বিষয়। সিবিআইয়ের হেফাজতের নির্দেশের অর্থ এই নয় যে সোমনাথ দে-র বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তদন্তের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে এক তরুণী চিকিৎসক-পড়ুয়ার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা সামনে আসে। সেই মামলায় সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মণ্ডলের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত হয়েছে।
তবে সোমনাথ দে-কে যে মামলায় সিবিআই হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, তার মূল প্রশ্ন দেহ সৎকারের প্রক্রিয়া এবং তথ্যপ্রমাণ নষ্টের অভিযোগ। এই তদন্তের ফল থেকে কী তথ্য সামনে আসে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে সিবিআইয়ের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আদালতে জমা দেওয়া রিপোর্টের জন্য।
নির্যাতিতার পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই দেহ সৎকারের ঘটনায় কারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কোন পরিস্থিতিতে এত দ্রুত সৎকার সম্পন্ন হয়েছিল এবং প্রশাসনিকভাবে কী কী পদক্ষেপ করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সিবিআইয়ের তদন্তে এই বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে আদালতে আগেও জানানো হয়েছিল।
সোমনাথ দে-কে দু’দিনের হেফাজতে নেওয়ার ফলে তদন্তকারীরা তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। তবে সেই জিজ্ঞাসাবাদে কী তথ্য উঠে আসে, কোনও নতুন প্রমাণ মেলে কি না এবং তার ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হয়—তা এখনও স্পষ্ট নয়।
আরজি কর মামলায় ন্যায়বিচারের দাবির পাশাপাশি দেহ সৎকার সংক্রান্ত অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত চাইছে নির্যাতিতার পরিবার। সোমনাথ দে-র সিবিআই হেফাজত সেই তদন্তের একটি নতুন ধাপ। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে তদন্তের ফল এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে।



