এক ধাক্কায় ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত কমল ক্যানসারের কিছু ওষুধের দাম, ৯ নভেম্বর থেকে নতুন দর

ক্যানসারের ওষুধের অতিরিক্ত দাম নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণের পরই ৫৪৩টি ব্র্যান্ডের সংশোধিত মূল্য প্রকাশ করল এনপিপিএ। কয়েকটি ওষুধের দাম কমেছে ৯০ শতাংশেরও বেশি, নতুন দর কার্যকর ৯ নভেম্বর থেকে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ক্যানসারের চিকিৎসার খরচ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খবর। ১৩৭টি নন-শিডিউলড অ্যান্টি-ক্যানসার ওষুধের আওতায় ৫৪৩টি ব্র্যান্ডের সংশোধিত সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য বা এমআরপি প্রকাশ করেছে ভারতের ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি (এনপিপিএ)। নতুন দাম কার্যকর হবে আগামী ৯ নভেম্বর থেকে। কয়েকটি ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে দাম ৯০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। তবে সব ক্যানসারের ওষুধের দাম একই হারে কমেনি; কিছু দামি ওষুধের মূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে।

ওষুধের বাণিজ্যিক মার্জিন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চিকিৎসার খরচ কমানোই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য। ১৭ অক্টোবর ১৩৭টি নন-শিডিউলড অ্যান্টি-ক্যানসার ওষুধের ক্ষেত্রে ট্রেড মার্জিন র‍্যাশনালাইজেশনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল এনপিপিএ। তার ভিত্তিতে ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির জমা দেওয়া তথ্যের পর সংশোধিত মূল্যতালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

কোন ওষুধের দাম কতটা কমল?

এনপিপিএর প্রকাশিত তালিকায় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ওষুধের সংশোধিত এমআরপি দেওয়া হয়েছে। ওষুধের উপাদান এক হলেও ব্র্যান্ড, ডোজ, প্যাকের আকার এবং প্রস্তুতকারক অনুযায়ী দাম আলাদা হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট ওষুধের দাম যাচাই করার সময় সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ড ও প্যাকের তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।

সরকারি তালিকার কয়েকটি উদাহরণ:

  • অ্যানাস্ট্রোজল: RPG Life Sciences-এর ‘Anarzole’ ব্র্যান্ডের ১ মিলিগ্রাম ট্যাবলেটের ১০টির প্যাকের দাম ৬৯৫.৭৬ টাকা থেকে কমে ৭৩ টাকা হয়েছে।
  • অ্যাজাসিটিডিন: Dr. Reddy’s Laboratories-এর ‘Azacytin’ ১০০ মিলিগ্রামের ইনজেকশনের দাম ৬,৩৩৭ টাকা থেকে কমে ১,৪৯৫.০৪ টাকা হয়েছে।
  • বেভাসিজুম্যাব: Abbott-এর ‘Bevacizab’ ১০০ মিলিগ্রাম/৪ মিলিলিটারের ইনজেকশনের দাম ২১,৭৬৭.৭০ টাকা থেকে কমে ৫,৯৩০.১৩ টাকা হয়েছে।
  • ডাসাটিনিব: ‘Dasanat 20’ ব্র্যান্ডের ২০ মিলিগ্রামের ৬০টি ট্যাবলেটের প্যাকের দাম ২,৮১২.৫০ টাকা থেকে কমে ১,০৮৫.৯৩ টাকা হয়েছে।

এই উদাহরণগুলি থেকে স্পষ্ট, সংশোধিত তালিকায় একাধিক ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত দাম কমার দাবি সব ওষুধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কোনও রোগীকে চিকিৎসক যে ব্র্যান্ড, ডোজ ও প্যাকের ওষুধ লিখেছেন, তার সংশোধিত মূল্য আলাদা করে যাচাই করা উচিত।

সব দামি ক্যানসারের ওষুধের দাম কমেনি

দাম কমানোর সিদ্ধান্তের মধ্যেও কয়েকটি বহুল আলোচিত ওষুধের এমআরপি অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমিউনোথেরাপিতে ব্যবহৃত ‘কিট্রুডা’র (পেমব্রোলিজুম্যাব) ১০০ মিলিগ্রাম ইনজেকশনের দাম ২ লক্ষ ১৬ হাজার ৫০০ টাকা রয়েছে। ‘ক্রিক্সানা’র (রিবোসিক্লিব) দামও সংশ্লিষ্ট প্যাকের ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, সংশোধিত মূল্যতালিকা প্রকাশের অর্থ এই নয় যে ক্যানসারের প্রতিটি ওষুধ সস্তা হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে দামি পেটেন্টযুক্ত ওষুধের ক্ষেত্রে রোগীর প্রকৃত খরচ কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে নির্দিষ্ট ওষুধের মূল্য, হাসপাতালের বিলিং পদ্ধতি এবং প্রযোজ্য রোগী-সহায়তা কর্মসূচির উপর।

কেন ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ?

ক্যানসারের চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের দাম নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ নিতে হয়, ফলে চিকিৎসার মোট খরচ পরিবারের উপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। ওষুধের প্রস্তুতকারক থেকে পরিবেশক, খুচরো বিক্রেতা ও হাসপাতাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বাণিজ্যিক মার্জিন যোগ হওয়ায় রোগীর চূড়ান্ত খরচ বাড়তে পারে।

এনপিপিএর ১৭ অক্টোবরের সিদ্ধান্তে চিহ্নিত ১৩৭টি নন-শিডিউলড অ্যান্টি-ক্যানসার ওষুধের বাণিজ্যিক মার্জিন প্রথম বিক্রয়পর্যায়ের দামের ভিত্তিতে ৩০ শতাংশে সীমাবদ্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সরকারের বক্তব্য, এর মাধ্যমে অতিরিক্ত মার্জিন কমিয়ে ওষুধকে রোগীদের কাছে আরও সাশ্রয়ী করা এবং সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুতকারকদের সংশোধিত মূল্যতথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। নতুন দর কার্যকর হওয়ার পর ওষুধ বিক্রেতা ও হাসপাতালগুলিকেও সংশোধিত এমআরপি মেনে চলতে হবে। মূল্যতালিকা প্রকাশ এবং নিয়ম মেনে ওষুধ বিক্রি হচ্ছে কি না, তা নজরদারির আওতায় থাকবে।

সুপ্রিম কোর্টে ১১ হাজার টাকার ওষুধের বিল ১.৩০ লক্ষ, কী ঘটেছিল?

ক্যানসারের ওষুধের মূল্য নিয়ে এই পরিবর্তনের সময়েই বেসরকারি হাসপাতালে ওষুধের দাম ও বাণিজ্যিক মার্জিন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হয়েছে। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চে ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে একটি উদাহরণ উঠে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, এক রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় একটি ইনজেকশনের ডিলার মূল্য ছিল প্রায় ১১ হাজার টাকা, অথচ বেসরকারি হাসপাতালে তার জন্য ১.৩০ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছিল। রোগীর পরিবার বাইরে থেকে ওষুধ কিনে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও হাসপাতাল তা গ্রহণ করেনি বলে আদালতে জানানো হয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওষুধের ক্রয়মূল্য এবং রোগীর কাছ থেকে নেওয়া দামের মধ্যে এত বড় ব্যবধান কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে শীর্ষ আদালত। শুনানিতে হাসপাতালের পক্ষে আইনজীবী মুকুল রোহতগি যুক্তি দেন, হাসপাতালের পরিকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও সার্বক্ষণিক পরিষেবা বজায় রাখতে আয়ের প্রয়োজন রয়েছে। কেন্দ্রও জানায়, ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রোগীর সাশ্রয়, প্রতিযোগিতা, গবেষণা ও ওষুধের সরবরাহ—সব দিক বিবেচনা করতে হয়।

আদালত ওষুধের দাম ও বাণিজ্যিক মার্জিন নিয়ন্ত্রণে এনপিপিএর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। এই মামলায় শীর্ষ আদালত রায় সংরক্ষিত রেখেছে। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণ নিজে থেকে হাসপাতাল বা ওষুধ সংস্থার বিরুদ্ধে নতুন কোনও মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করে না।

৯ নভেম্বর থেকে কীভাবে নতুন দাম যাচাই করবেন?

এনপিপিএর সংশোধিত মূল্যতালিকা অনুযায়ী নতুন এমআরপি ৯ নভেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। রোগী ও পরিবারের সদস্যরা নির্দিষ্ট ওষুধের ব্র্যান্ড, ডোজ ও প্যাকের আকার মিলিয়ে নতুন দাম যাচাই করতে পারেন। সরকারি এনপিপিএ ওয়েবসাইটে সংশোধিত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ‘Pharma Sahi Daam’ অ্যাপের মাধ্যমেও ওষুধের দাম যাচাই করার সুযোগ রয়েছে।

ক্যানসারের ওষুধের দাম কমানোর এই পদক্ষেপ অনেক রোগীর চিকিৎসার খরচ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে কতটা সাশ্রয় হবে, তা নির্ভর করবে তাঁদের ব্যবহৃত ওষুধের উপর। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনও ওষুধের ব্র্যান্ড বা ডোজ পরিবর্তন করা উচিত নয়।

 

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর