সরশুনা কাণ্ডে একই রাস্তায় পুনর্নির্মাণ! কোমরে দড়ি বেঁধে খালি গায়ে, খালি পায়ে ধৃতদের হাঁটাল পুলিশ!

সরশুনায় তিন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে নগ্ন করে হাঁটানোর অভিযোগের তদন্তে ধৃতদের খালি গায়ে ও খালি পায়ে নিয়ে যায় পুলিশ। পুনর্নির্মাণের পদ্ধতি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

কলকাতার সরশুনায় তিন ব্যক্তিকে বিবস্ত্র করে রাস্তায় হাঁটানোর অভিযোগের তদন্তে এবার সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পুলিশের পদক্ষেপ ঘিরে প্রশ্ন উঠল। অভিযোগ, এক যুবক, তাঁর বাবা ও বন্ধুকে প্রকাশ্যে হেনস্থা করার ঘটনায় ধৃত তিনজনকে মঙ্গলবার কোমরে দড়ি বেঁধে, খালি গায়ে ও খালি পায়ে এলাকায় হাঁটিয়ে নিয়ে যায় পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্যই তাঁদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তবে এই পদ্ধতি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক মহলের একাংশ আপত্তি জানিয়েছে।

রবিবার সন্ধ্যায় সরশুনার ক্ষুদিরামপল্লি এলাকায় ঘটনাটির সূত্রপাত। অভিযোগ, ১৩ বছরের এক কিশোরীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তাঁকে চুম্বন করেন ১৮ বছরের এক যুবক। বিষয়টি জানতে পেরে কিশোরীর পরিবারের সদস্যরা যুবক ও তাঁর ১৯ বছরের বন্ধুকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ। পরে যুবকের বাবাকেও ডেকে পাঠানো হয়। তিনজনকে আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখিয়ে পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয় এবং প্রায় ৫০ মিটার রাস্তা দিয়ে হাঁটানো হয় বলে অভিযোগ।

যুবকের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে সরশুনা থানায় মামলা দায়ের হয়। কিশোরীর বাবা প্রদীপ সরকার, মা রিঙ্কু সরকার এবং মামা রাহুল বর্মনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। অভিযোগে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কথা উঠলেও, সেটি এখনও উদ্ধার হয়নি বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

সরশুনা কাণ্ডে একই রাস্তায় পুনর্নির্মাণ! কোমরে দড়ি বেঁধে খালি গায়ে, খালি পায়ে ধৃতদের হাঁটাল পুলিশ!
সরশুনা কাণ্ডে একই রাস্তায় পুনর্নির্মাণ! কোমরে দড়ি বেঁধে খালি গায়ে, খালি পায়ে ধৃতদের হাঁটাল পুলিশ!

মঙ্গলবার সকালে পুলিশ ধৃতদের নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। তাঁদের কোমরে দড়ি বাঁধা ছিল, পরনে ছিল হাফ প্যান্ট বা বারমুডা। খালি গায়ে ও খালি পায়ে তাঁদের হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা সেই দৃশ্য দেখতে ভিড় করেন। পুলিশের বক্তব্য, তদন্তের প্রয়োজনে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছিল। তবে পুনর্নির্মাণের সময় ধৃতদের এইভাবে প্রকাশ্যে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (Association for Protection of Democratic Rights বা APDR)-এর সাধারণ সম্পাদক আলতাফ আহমেদ পুলিশের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রথম ঘটনায় পুলিশ সময়মতো পৌঁছলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। তার পরে অভিযুক্তদের অর্ধনগ্ন অবস্থায় হাঁটানোও পুলিশের দায়িত্বের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ও দুই ঘটনার নিন্দা করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, কাউকে খালি গায়ে ও খালি পায়ে হাঁটালেই কি অপরাধের শাস্তি হয়ে যায়? তাঁর মতে, প্রথমে তিন ব্যক্তিকে নগ্ন করে হাঁটানোর অভিযোগ এবং পরে ধৃতদের একইভাবে প্রকাশ্যে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা—দুটিই উদ্বেগজনক।

এর আগেও অভিযুক্তদের কোমরে দড়ি বেঁধে প্রকাশ্যে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে (Calcutta High Court) জনস্বার্থ মামলা হয়েছিল। গত জুনে বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত ও বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করেছিল, পুলিশ আইন মেনে গ্রেফতার ও তদন্ত করতে পারে, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে অভিযুক্তের সম্মানহানি করতে পারে না। সেই মামলায় রাজ্যের কাছে রিপোর্টও চেয়েছিল আদালত।

সরশুনার ঘটনায় পুলিশের পুনর্নির্মাণের পদ্ধতি ঘিরে তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তদন্তের প্রয়োজনে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া এবং অভিযুক্তকে জনসমক্ষে হেনস্থার পরিস্থিতিতে ফেলার মধ্যে সীমারেখা কোথায়? ঘটনার তদন্তের পাশাপাশি পুলিশের পদক্ষেপও যে আলোচনায় উঠে এসেছে, তা স্পষ্ট।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর