চোরবাগান দুর্গাপুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের গতি বাড়াল পুলিশ। রবিবার অভিযুক্ত ঘোষক সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টুকে উত্তর কলকাতার চোরবাগান মণ্ডপে নিয়ে গিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করানো হয়েছে বলে সূত্রের খবর। অন্যদিকে, তদন্তের স্বার্থে মূল মণ্ডপে লক্ষ্মীপুজোর অনুমতি না মেলায় ক্লাবঘরের পাশে অস্থায়ী মঞ্চে পুজোর আয়োজন করা হয়। কাণ্ডে ধৃত আর এক ঘোষক কুশল মজুমদারের ‘পুলিশের এক জনের নির্দেশে’ ঘোষণা করার দাবি নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে।
১৭ অক্টোবর মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপে ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে। ভিড়ের চাপে প্রাণ হারান ১৯ জন, আহত হন ২৫ জন। মণ্ডপ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা জানিয়ে মাইকে ঘোষণা করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি। সেই ঘোষণার পরেই দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বেরোনোর পথে হুড়োহুড়ি শুরু হয় কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
নদিয়া থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল সঞ্জীব রাহাকে। রবিবার বিকেল ৪টে নাগাদ তাঁকে পুলিশ চোরবাগানের ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। ক্লাবঘরেও তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। সূত্রের খবর, সঞ্জীবকে সামনে রেখে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে এবং তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে তদন্তকারীরা পুনর্নির্মাণে কী কী তথ্য পেয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ্যে আসেনি।
চোরবাগান কাণ্ডের তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) কাজ করছে। ঘটনার দিন মাইকে ঘোষণা করা দুই ব্যক্তিকে চিহ্নিত করতে সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রে খবর। তদন্তকারীদের বক্তব্য, মণ্ডপ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা জানিয়ে দর্শনার্থীদের দ্রুত বেরিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। ওই ঘোষণার সঙ্গে পদপিষ্টের ঘটনার যোগসূত্র কী, তা তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
কুশল মজুমদার গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, এক পুলিশকর্মীর কথাতেই তিনি সপ্তমীর সন্ধ্যায় ওই ঘোষণা করেছিলেন। তবে সেই পুলিশকর্মীর নাম জানানো হয়নি। কী পরিস্থিতিতে ঘোষণা করা হয়েছিল, তা নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন কুশল। তাঁর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে তদন্তকারীরা ঘটনার দিন চোরবাগানে দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছেন।
পুলিশ সূত্রের খবর, সপ্তমীর সন্ধ্যায় ওই এলাকায় ৮০ থেকে ৯০ জন পুলিশকর্মী মোতায়েন ছিলেন। তবে মণ্ডপের ভিতরের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন বেসরকারি সংস্থার কর্মীরা। পুলিশ মূলত সংলগ্ন রাস্তার যান চলাচল ও ভিড় সামলানোর দায়িত্বে ছিল বলে জানা গিয়েছে। কার কোথায় ডিউটি ছিল, তাঁরা দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেছিলেন কি না এবং ঘোষণার নেপথ্যে কোনও পুলিশকর্মীর ভূমিকা ছিল কি না—সব দিকই খতিয়ে দেখছে SIT। কুশলের দাবি এখনও তদন্তাধীন; তা থেকে কোনও পুলিশকর্মীর দায় নিশ্চিত করে বলা যায় না।
এদিকে, দুর্গাপুজোর মণ্ডপে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হলেও সেই জায়গায় লক্ষ্মীপুজো করা যায়নি। তদন্তকারীদের আশঙ্কা, মূল মণ্ডপে পুজোর আয়োজন করলে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট হতে পারে। সেই কারণে মণ্ডপটি রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিমা বের করে আনার জন্য গেটের একাংশ কাটতে হয়েছিল। শনিবার পুলিশি নিরাপত্তায় প্রতিমা নিরঞ্জন সম্পন্ন হয়।
রবিবার অমর বসু সরণিতে ক্লাবঘরের পাশে দুর্গাপুজোর সময় তৈরি করা অস্থায়ী মঞ্চেই লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন করা হয়। মূল মণ্ডপে পুজো না হওয়ায় দীর্ঘদিনের রীতি বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। তদন্তের স্বার্থে ঘটনাস্থল অক্ষত রাখার সিদ্ধান্তের কারণে পুজোর ব্যবস্থায় এই পরিবর্তন করতে হয়েছে।
চোরবাগান কাণ্ডে এখনও পর্যন্ত একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা শুধু মাইকে ঘোষণার বিষয়টিই নয়, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখছেন। ১৯ জনের মৃত্যুর কারণ ও দায় নির্ধারণে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।



