চোরবাগান কাণ্ডে মাইকে আতঙ্কের ঘোষণা কে করেছিলেন? সেন্টু-কালিয়াকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরার প্রস্তুতি

চোরবাগান পদপিষ্ট কাণ্ডে মণ্ডপ ভেঙে পড়ার ঘোষণা কে করেছিলেন, তা জানতে সেন্টু ও কালিয়াকে মুখোমুখি জেরা করতে চাইছে পুলিশ। কণ্ঠস্বরের নমুনা ও ভিডিয়ো-অডিয়োও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপুজোয় পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের কেন্দ্রে এ বার মাইকে ঘোষণা করার বিষয়টি। ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’ বলে কে ঘোষণা করেছিলেন, কখন সেই ঘোষণা হয়েছিল এবং কারও নির্দেশে তা করা হয়েছিল কি না—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছে কলকাতা পুলিশ (Kolkata Police)। তদন্তকারীদের নজরে থাকা দুই ঘোষক সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু এবং কুশল মজুমদার ওরফে কালিয়াকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করার পরিকল্পনা রয়েছে। ঘোষণার সময়কার ঘটনাক্রম মিলিয়ে দেখে বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট হতে চাইছেন তদন্তকারীরা।

চোরবাগান মণ্ডপে গত ১৭ অক্টোবর সপ্তমীর সন্ধ্যায় ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে। তাতে ১৯ জনের মৃত্যু হয়, আহত হন আরও অনেকে। ঘটনার পর ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিয়োয় মাইকে মণ্ডপ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা জানিয়ে দর্শনার্থীদের দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার কথা বলতে শোনা যায়। ওই ঘোষণা ভিড়ের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করেছিল কি না, তা তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে ঘোষণাটিই একমাত্র কারণে বিপর্যয় ঘটেছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, বেরোনোর পথ এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দিকগুলিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে প্রথমে গ্রেফতার হন চোরবাগান সর্বজনীনের পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু। পরে শুক্রবার গ্রেফতার করা হয় কুশল মজুমদার ওরফে কালিয়াকে। প্রাথমিক তদন্তে সেন্টুকে পুজোর ঘোষণার মূল দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। কিন্তু বিপর্যয়ের ঠিক আগে ও পরে মাইকে কী বলা হয়েছিল, কে কখন মাইক্রোফোন ব্যবহার করেছিলেন এবং সেই সময় কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে আরও তথ্য মিলিয়ে দেখতে চাইছেন তদন্তকারীরা।

এই কারণেই দুই ধৃতকে মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে তদন্ত সূত্রে খবর। তাঁদের বক্তব্যের মধ্যে কোনও অসঙ্গতি রয়েছে কি না, ঘোষণার সময় তাঁরা কোথায় ছিলেন এবং কী তথ্যের ভিত্তিতে মাইকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল—এই বিষয়গুলি যাচাই করা হতে পারে। পাশাপাশি, ঘটনাস্থলের ভিডিয়ো, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে ধৃতদের বয়ান মিলিয়ে দেখার চেষ্টা চলছে।

কালিয়া অবশ্য সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি হাতে লেখা বক্তব্যে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর দাবি, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে তিনি পুজো কমিটির ক্লাবে গিয়েছিলেন। সেখানে গিরিশ পার্ক থানার দুই পুলিশকর্মী উপস্থিত ছিলেন বলেও দাবি করেছেন তিনি। তাঁদের জন্য চা আনতে যাওয়ার পর ক্লাবে ফিরে কাজ করছিলেন বলে তাঁর বক্তব্য। কিছুক্ষণ পরে একটি শব্দ শুনতে পান এবং পুলিশকর্মীরা ক্লাবঘর থেকে বেরিয়ে যান বলে ওই লেখায় দাবি করেছেন কালিয়া।

কালিয়ার আরও দাবি, পুজো কমিটির সম্পাদকের ছেলে কবির তাঁকে জানান, মণ্ডপের পিছনের অংশ ভেঙে পড়েছে। এর পর তিনি বাইরে যাওয়ার সময় এক পুলিশকর্মী তাঁদের মাইকে ঘোষণা করতে বলেন বলে তাঁর বক্তব্য। সামনে গিয়ে আগের ঘোষককে দেখতে না পেয়ে তাঁকেই মাইকে বলতে হয় বলে দাবি করেছেন কালিয়া। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মাইকে ঘোষণা করার পূর্ব অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। তবে সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত এই বক্তব্যের প্রতিটি অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি; তাই তা তাঁর দাবি হিসেবেই বিবেচ্য।

অন্যদিকে, তদন্তকারীরা ঘটনার সময়কার অডিয়ো ও ভিডিয়ো খতিয়ে দেখছেন। ধৃত দুই ঘোষকের কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ করে ঘটনাস্থলের রেকর্ডিংয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্যও পুলিশের আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাতে নির্দিষ্ট ঘোষণা কার কণ্ঠে করা হয়েছিল, তা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সহায়তা মিলতে পারে। তবে কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ বা অডিয়ো পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে কি না এবং তার ফল কী, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না।

শনিবার ব্যাঙ্কশাল আদালত কালিয়াকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তদন্তকারীরা তাঁর বক্তব্যের পাশাপাশি সেন্টুর বক্তব্য ও অন্যান্য প্রমাণের মধ্যে মিল-অমিল খতিয়ে দেখতে পারেন। ঘোষণাটি কারও নির্দেশে করা হয়েছিল কি না, কিংবা ঘোষণার আগে মণ্ডপের পরিস্থিতি সম্পর্কে কী তথ্য তাঁদের কাছে ছিল—সেই প্রশ্নগুলির উত্তরও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চোরবাগান বিপর্যয়ের তদন্ত অবশ্য শুধু ঘোষকদের ভূমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থা, ভিড় সামলানোর পরিকল্পনা, নিরাপত্তার বন্দোবস্ত এবং পুজো কমিটির প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজ্য সরকার ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর নেতৃত্বে বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করেছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি এই দলও বিপর্যয়ের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য দায় খতিয়ে দেখছে।

এ দিকে দুর্ঘটনায় আহতদের তালিকা ও চিকিৎসার সহায়তা নিয়েও প্রশ্ন সামনে এসেছে। শনিবার সোনারপুরের বাসিন্দা সুদীপ্ত হালদার চোরবাগানে গিয়ে পুলিশের কাছে তাঁর দুই আহত বোনের নাম ও নথি জমা দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁর দাবি, আহত হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের নাম তালিকায় নেই। চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা পাওয়ার আশায় তিনি নথি জমা দেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তালিকা সংশোধন বা সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে প্রশাসনের তরফে কী পদক্ষেপ করা হয়, সেটিও নজরে থাকবে।

সব মিলিয়ে, চোরবাগান কাণ্ডে মাইকের ঘোষণা ঘিরে তদন্তের পরবর্তী ধাপ গুরুত্বপূর্ণ। সেন্টু ও কালিয়াকে মুখোমুখি জেরা, কণ্ঠস্বরের নমুনা পরীক্ষা এবং ঘটনার সময়কার ভিডিয়ো-অডিয়ো মিলিয়ে দেখার মাধ্যমে ঘোষণার প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা চলছে। তবে বিপর্যয়ের জন্য কার কতটা দায়, তা নির্ধারণ করতে তদন্তের ফল এবং সংগৃহীত প্রমাণের উপরই নির্ভর করতে হবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর