প্রয়াত বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী (Jogen Chowdhury)। রবিবার, ২৫ অক্টোবর সকালে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলার অন্যতম পরিচিত মুখ। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বিরল ধরনের ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। সম্প্রতি মূত্রনালির সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। শনিবার তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় শিল্পজগতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় ১৪ মাস ধরে মাইলোপ্রোলিফেরেটিভ নিওপ্লাজম (Myeloproliferative Neoplasm) নামে এক ধরনের রক্তের ক্যানসারে ভুগছিলেন শিল্পী। চলছিল কেমোথেরাপি। দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর সময় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। মূত্রনালির সংক্রমণের পাশাপাশি তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। সংক্রমণজনিত জটিলতার কারণে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠে। শনিবার তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল বলে হাসপাতাল সূত্রে খবর।
১৯৩৯ সালে অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের দাহারপাড়ায় জন্ম যোগেন চৌধুরীর। দেশভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন তিনি। ছোটবেলায় মায়ের আলপনা আঁকার দক্ষতা এবং পরিবারের শিল্পচর্চার পরিবেশ তাঁর মধ্যে ছবি আঁকার আগ্রহ তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে সেই আগ্রহই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান পরিচয়।
কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফ্টে (Government College of Art and Craft) পড়াশোনা করেন যোগেন। ১৯৬০ সালে শিল্পশিক্ষা শেষ করার পরে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে হ্যান্ডলুম বোর্ডে নকশাকার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালে ফরাসি সরকারি বৃত্তি নিয়ে প্যারিসে উচ্চশিক্ষার জন্য যান। ইউরোপীয় শিল্পচর্চার অভিজ্ঞতা তাঁর কাজের পরিসরকে আরও প্রসারিত করে।
দেশে ফিরে শিল্পী হিসেবে নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তোলেন যোগেন। তাঁর ছবিতে মানুষের শরীর, মুখের অভিব্যক্তি, সম্পর্কের টানাপড়েন এবং সামাজিক বাস্তবতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রেখার ঘন ব্যবহার, শরীরের গঠনে নিজস্ব ভঙ্গি এবং আলো-ছায়ার অভিনব প্রয়োগ তাঁর ছবিকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। জলরং, কালি, প্যাস্টেল ও তেলরং—বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করলেও তাঁর শিল্পভাষার নিজস্বতা ছিল স্পষ্ট।
শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, সমাজ ও ক্ষমতার সম্পর্কও উঠে এসেছে তাঁর কাজে। মানুষের অসহায়তা, সম্পর্কের জটিলতা, শহুরে জীবনের একাকিত্ব এবং সামাজিক অসংগতিকে তিনি নিজের মতো করে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন। ভারতীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক শিল্পভাবনার মেলবন্ধন তাঁর সৃষ্টিকে দেশ-বিদেশের শিল্পমহলে পরিচিতি দিয়েছে।
শিল্পচর্চার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও সামলেছেন যোগেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ভবনের (Rashtrapati Bhavan) আর্ট গ্যালারির কিউরেটর বা শিল্পসংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। বিশ্বভারতীর কলাভবনের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল। শিল্পশিক্ষা ও শিল্পচর্চার পরিসরে তাঁর অবদান তাঁকে শুধু সফল চিত্রকর নয়, বরং একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।
বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গেও যোগেন চৌধুরীর সম্পর্ক ছিল। একাধিক পুজোর প্রতিমা, চালচিত্র এবং থিমের নকশায় তাঁর শিল্পভাবনার ছাপ পড়েছে। বেহালা নূতন দল-সহ বিভিন্ন পুজো উদ্যোক্তাদের সঙ্গে তাঁর কাজ বাংলার উৎসবের পরিসরেও শিল্পকলার উপস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল।
রাজনীতির ময়দানেও সক্রিয় ছিলেন এই শিল্পী। ২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন তিনি। ২০২০ সাল পর্যন্ত সাংসদ ছিলেন যোগেন। শিল্পীসত্তার পাশাপাশি সংসদীয় জীবনের অভিজ্ঞতাও তাঁর বহুমুখী পরিচয়ের অংশ হয়ে রয়েছে।
জীবনভর শিল্পচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে দেশ-বিদেশের একাধিক সম্মান পেয়েছেন যোগেন চৌধুরী। ২০০১ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকারের কালিদাস সম্মান এবং ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বঙ্গবিভূষণ সম্মান তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তির মধ্যে রয়েছে। তাঁর শিল্পকর্ম বিভিন্ন সংগ্রহশালা ও প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত রয়েছে।
একদিকে মানুষের অন্তর্জগৎ, অন্যদিকে সমাজের নানা টানাপড়েন—এই দুইয়ের মধ্যে সেতু তৈরি করেছিল যোগেন চৌধুরীর শিল্প। তাঁর প্রয়াণে শুধু একজন প্রবীণ চিত্রকরকে হারাল না ভারতীয় শিল্পজগৎ; হারাল এমন এক শিল্পীকে, যাঁর নিজস্ব রেখা ও দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলায় আলাদা জায়গা তৈরি করেছিল।



